যশোরে ‘সবজি জোনে’ কৃষকদের হাহাকার

যশোরের বৃহত্তর সবজি উৎপাদন এলাকা সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ও বারিনগর ইউনিয়নে ‘স্ট্রোক’ -এ আক্রান্ত হয়ে বেগুন গাছ মরে ক্ষেত উজাড় হয়ে যাচ্ছে।...

যশোরের বৃহত্তর সবজি উৎপাদন এলাকা সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ও বারিনগর ইউনিয়নে ‘স্ট্রোক’ -এ আক্রান্ত হয়ে বেগুন গাছ মরে ক্ষেত উজাড় হয়ে যাচ্ছে। এই সাথে ‘তুলশী পড়া’ রোগে আক্রান্ত হওয়ায় ফলন বন্ধ হয়ে গেছে। শিম ক্ষেতেও দেখা দিয়েছে মড়ক। বর্তমান সময় পর্যন্ত বিঘা প্রতি যেখানে তিন লাখ টাকার বেগুন ও ৫০ হাজার টাকার শিম উৎপাদন হওয়ার কথা সেখানে দুই হাজার টাকার সবজিও কৃষকরা পাননি। এলাকার মাঠে মাঠে এখন কৃষকের হাহাকার। কৃষি বিভাগ স্ট্রোককে ব্যাকটেরিয়াল উইলড ও তুলশী পড়াকে এক ধরনের ভাইরাস বলছে।

চুড়ামনকাটি ও বারিনগর ইউনিয়ন সবজি জোন বলে খ্যাত। সবজি উৎপাদনে এই জোনের অন্যতম গ্রাম শাহবাজপুর। এই গ্রামের পাঁচ শতাধিক পরিবারের সবাই সবজি চাষের সাথে জড়িত। সবজি চাষি কামরুল ইসলাম জানান, গ্রামটিতে প্রায় এক হাজার বিঘা জমিতে সবজি চাষ হয়। এই গ্রামে কৃষিজাত ফসলের মধ্যে সবজিই প্রধান। সুদূর অতীতকাল থেকে এখানে  সবজি চাষ হয়ে আসছে। এখানকার ভূমি প্রকৃতি সবজি চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। গ্রামবাসীর যশ খ্যাতি অর্থনৈতিক অগ্রগতি সবই সবজিকে ঘিরে। কিন্তু হালে এর চাষাবাদ করতে গিয়ে কৃষকরা বিপর্যয়ের মুখে পড়ছেন। নানা রকম রোগ বালাইয়ের কারণে তারা সর্বস্বান্ত হচ্ছেন।

যশোর সদর উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা অসিত ঘোষ ঢাকাটাইমসকে জানান, সদর উপজেলায় শীতকালীন সবজি চাষ হয়েছে তিন হাজার ৬৮৫ হেক্টরে। এরমধ্যে শিমের চাষ হয়েছে ৯২০ হেক্টরে। ৩৬০ হেক্টরে হয়েছে বেগুনের চাষ। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য সবজির মধ্যে রয়েছে বাধা কপি ৬৪০ হেক্টর, ফুল কপি ১১৬ হেক্টর,  মূলা ৫১০ হেক্টর, পটল ৩১০ হেক্টর এবং আলুসহ অন্যন্য সবজি ৭৫৪ হেক্টর। প্রায় সমপরিমাণ সবজি চাষ হয় গ্রীষ্ম মৌসুমেও। 

আবাদকৃত শীতকালীন সবজির মধ্যে প্রায় এক তৃতীয়াংশ হলো বেগুন ও শীম। এই দুটি সবজি ‘স্ট্রোক’ ‘তুলশী পড়া’ মড়কে সাবাড় হয়ে যাচ্ছে। অসিত ঘোষ জানান, স্ট্রোক বলে কোনো রোগের কথা তার জানা নেই। তবে এবারের অতি বর্ষণ বেগুন গাছের মড়কের অন্যতম কারণ হতে পারে। তুলশী পড়া রোগটা এক ধরনের ভাইরাস। ক্ষেতের কোনো একটি গাছ আক্রান্ত হওয়ার সাথে সাথে সেই গাছটি কেটে ফেলে পুড়িয়ে অথবা মাটিতে পুঁতে ফেলতে হয়।

কামরুল ইসলাম জানান, গত বছরপাঁচেক হলো বেগুনে স্ট্রোক রোগ দেখা দিচ্ছে। এই রোগে আক্রান্ত গাছ দু-একদিনের মধ্যে মরে যাচ্ছে। যে ক্ষেতে একবার এই রোগ দেখা দিচ্ছে সেই ক্ষেত আর রক্ষা পাচ্ছে না। এবার এই রোগ ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই যেমন মানুষ হঠাৎ স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। বেগুন গাছের ঠিক তেমনটাই হচ্ছে। বিকালে যে গাছটা সবুজ সতেজ দেখা যায় সকালে সেই গাছটাই দেখা যায় ঢলে পড়তে। আর দিন পার না হতেই গাছটি শুকিয়ে মরে যায়। মানুষের স্ট্রোকের সাথে বেগুনের এই রোগের মিল থাকায় কৃষকরা একে স্ট্রোক বলে থাকেন। গোটা এলাকা জুড়ে রোগটা এই নামেই পরিচিত।
স্ট্রোকের প্রতিষেধক জানা না থাকায় কৃষকরা নীরব দর্শক হয়ে গাছের মড়ক দেখছেন আর হা-হুতাশ করে কাটাচ্ছেন। তুলশী পড়া প্রতিরোধে কীটনাশক কোম্পানির মাঠকর্মীদের পরামর্শ অনুযায়ী আক্রান্ত ক্ষেতে সুইটপ্রিন্ট ও টাইপিট নামের ওষুধ স্প্রে করছেন। 
কামরুল ইসলাম এবার সাড়ে তিন বিঘা জমিতে বেগুনের চাষ করেছেন। কিন্তু ক্ষেতের গাছগুলো সবই একে একে মরে যাচ্ছে। তিনি এক বিঘা শিমের চাষ করেছেন। তার অবস্থাও একই রকম। মড়ক লেগে শিম গাছ মরে যাচ্ছে। শাহবাজপুর মাঠে আবাদ হয়েছে বেগুন, শিম, বাঁধা কপি, ফুল কপি, মূলা, পটল, আলু প্রভৃতি। এর মধ্যে এক তৃতীয়াংশের আবাদ হয়েছে বেগুন ও শিমের। যা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

এ অবস্থা শুধু কামরুল ইসলামের নয়। গ্রামের সবিনুর রহমান, শিমুল হোসেন, রবিউল ইসলাম, ইব্রাহিম হোসেন, হাবিবুর রহমান, মিজানুর রহমান,  আবদুল গনি, আকসার আলী, গোলাম আজম, তুষার এমরান ও আবু হানিফসহ সব সবজি চাষি একই বিপর্যয়ের শিকার। আসকার আলী বলেন, ‘স্ট্রোকে বাগুন গাছ মরে ভুই (জমি) সব চুয়া (ফাঁকা) হয়ে যাচ্ছে।’
আবদুল গনি বেগুন চাষ করেছিলেন দেড় বিঘায়। তুষার এমরান চাষ করেছিলেন সাড়ে তিন বিঘায়। তাদের পুরো জমির বেগুন গাছ মরে গেছে। মরা বেগুন গাছ কেটে জ্বালানি করা হচ্ছে এবং ওই জমিতে নতুন করে অন্য সবজি চাষের চেষ্টা করা হচ্ছে। আবদুল গনির জমিতে নতুন করে মুলা চাষ করছেন। তুষার এমরান প্রস্তুতি নিচ্ছেন অন্য সবজি চাষের।
আবদুল গনি জানান, নতুন করে মুলা চাষ করে লোকসান হবে জেনেও চাষ করছেন। কারণ এখন মুলা কেজি প্রতি ৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আর মাসখানেকের মধ্যে মুলার দাম পড়ে গিয়ে বিক্রি হবে ২৫ পয়সা থেকে ৫০ পয়সা দরে। এই চাষ করতে বিঘা প্রতি খরচ হবে ১২ হাজার টাকা। এই খরচের দু-এক শতাংশও উঠবে না। ক্ষেত ফেলে না রেখে কিছু একটা করতে হবে। তাই মুলার চাষটা করা।
সবজি চাষিদের সবার একই অভিযোগ- উপজেলা কৃষি অফিসার আর ও উপ-সহকারী কৃষি অফিসার গ্রামে কোনো দিন আসেন না। এ ব্যাপারে সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা খালিদ সাইফুল্লাহ ঢাকাটাইমসকে জানান,  তিনি উপদ্রুত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। আসলে স্ট্রোক বলে কোনো রোগ নেই। যে রোগে বেগুন গাছ মরছে তার নাম ব্যাকটেরিয়াল উইলড। অজ্ঞতাবশত অতিমাত্রায় হরমনের ব্যবহার এই রোগের অন্যতম কারণ। তিনি খবর নিয়ে জেনেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার কৃষকরা নয় দিনে তিন প্রকার হরমন ব্যবহার করেছেন। যা নিয়ম বহির্ভূত। এবারের অতি বর্ষণও এর জন্য অনেকটা দায়ী। দেশে এই রোগ প্রতিরোধের কার্যকর কোনো ওষুধ নেই।

COMMENTS

Mountain View
নাম

অপরাধ বার্তা অভয়নগর অর্থনীতি আন্তর্জাতিক ইতিহাস/মুক্তিযুদ্ধ ইলেক্ট্রনিক্স ইসলাম ঐতিহ্য ঐতিহ্য/সংস্কৃতি কলাম কৃষি কৃষি বার্তা কেশবপুর খেলাধুলা গ্যালারী চাকরির খবর চাকুরী চুয়াডাঙ্গা চৌগাছা জাতী জাতীয় ঝিকরগাছা ঝিনাইদহ টিপস তথ্য প্রযুক্তি দর্শনীয় স্থান নড়াইল নিবন্ধ পরিবেশ প্রকৃতি/পরিবেশ প্রতিবেদন প্রবাস প্রশাসন ফেসবুক বাঘারপাড়া বিনোদন বিশেষ খবর বেনাপোল ব্যক্তিত্ব ব্যবসা/বানিজ্য ব্রেকিং নিউজ ভর্তি পরীক্ষা ভিডিও ভ্রমন মনিরামপুর মাগুরা মুক্তিযুদ্ধ যশোর যশোর সদর রাজনীতি রান্না লাইফ স্টাইল শার্শা শিক্ষাঙ্গন সংবাদ সংস্কৃতি সম্পাদকীয় সর্বশেষ সাফল্য সারাদেশ সাহিত্য সিনেমা স্বাস্থ্য Breaking Feature Greater Jessore Tips
false
ltr
item
যশোর নিউজ ২৪: Jessore News 24:: যশোরে ‘সবজি জোনে’ কৃষকদের হাহাকার
যশোরে ‘সবজি জোনে’ কৃষকদের হাহাকার
https://1.bp.blogspot.com/-8IJSx9Lfk2Q/WgG9DK0_JGI/AAAAAAAAQ6U/5yjQnMklzxsaBF-l8_7jnqe6Y90yOHJDwCLcBGAs/s320/sobji.jpg
https://1.bp.blogspot.com/-8IJSx9Lfk2Q/WgG9DK0_JGI/AAAAAAAAQ6U/5yjQnMklzxsaBF-l8_7jnqe6Y90yOHJDwCLcBGAs/s72-c/sobji.jpg
যশোর নিউজ ২৪: Jessore News 24:
http://www.jessorenews24.com/2017/11/blog-post_67.html
http://www.jessorenews24.com/
http://www.jessorenews24.com/
http://www.jessorenews24.com/2017/11/blog-post_67.html
true
286737489812364167
UTF-8
Not found any posts VIEW ALL Readmore Reply Cancel reply Delete By Home PAGES POSTS View All RECOMMENDED FOR YOU LABEL ARCHIVE SEARCH ALL POSTS Not found any post match with your request Back Home Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS CONTENT IS PREMIUM Please share to unlock Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy