৮ নভেম্বর, ২০১৭

যশোরের শার্শার মিজানের হাতের ছোঁয়ায় উদ্ভাবন নিত্য নতুন যন্ত্র

চরম দারিদ্র্যের কারণে একাডেমিক শিক্ষা লাভের সুযোগ হয়নি। শিশু বয়সেই নেমে পড়েছিলেন মজুরের কাজে।
শ্যালো মেশিন চালানো ও মেরামতের কাজ। সে সুবাদে ওই বয়সেই যন্ত্রের সান্নিধ্যে আসা। আর ওই যন্ত্রই তাঁর ভবিষ্যতের পথ বাতলে দেয়। শখের সঙ্গে জীবিকার পথ মিলে যাওয়ায় যন্ত্রকেই করে তোলেন জীবিকার বাহন। আর সেই পথচলার ধারাবাহিকতায় সেদিনের শিশুটি আজ একাধিক যন্ত্রের উদ্ভাবক। নতুন নতুন উদ্ভাবনের স্বীকৃতি হিসেবে পর পর আটটি জাতীয় পুরস্কার তাঁর ঝুলিতে।
যশোরের শার্শা উপজেলার নিজামপুর ইউনিয়নের আমতলা গাতিপাড়ার অজপাড়াগাঁয়ে ১৯৭১ সালের ৫ মে জন্ম মিজানুর রহমানের। আক্কাস আলী-খোদেজা খাতুন দম্পতির ছয় সন্তানের মধ্যে মিজান পঞ্চম। মা-বাবা কেউ বেঁচে নেই।
বর্তমানে আবাস গড়েছেন উপজেলা সদরের শ্যামলাগাছি গ্রামে।
বেঁচে থাকার তাগিদে ৮-৯ বছর বয়সেই মিজান নেমে পড়েন মজুরের কাজে। মাঠে শ্যালো মেশিন চালানো ও মেরামতের কাজ। পরবর্তী সময়ে নাভারণ বাজারে মোটরসাইকেলের গ্যারেজে কাজ পান। শুরু হয় তাঁর মোটর মেকানিকের কর্মজীবন। ছোটবেলা থেকেই শখ ছিল নতুন কিছু করার। নতুন কিছু জানার। তবে মেকানিক হিসেবে ইঞ্জিন তৈরিতে ছিল প্রবল আগ্রহ। সেই আগ্রহ পাখা মেলে মেকানিক জীবনে এসে। বর্তমানে শার্শা বাজারে ভাই ভাই ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ নামে তাঁর নিজেরই একটি মোটরসাইকেল গ্যারেজ রয়েছে।
মিজান প্রথমে উদ্ভাবন করেন হাফ ক্র্যাঙ্কশ্যাফট দিয়ে একটি আলগা ইঞ্জিন। বিশেষত্ব হলো, এই ইঞ্জিনের সব যন্ত্রপাতি বাইরে থেকে দেখা যায়। ইঞ্জিনটি একবার জ্বালানি তেল দিয়ে চালু করলে পরে আর জ্বালানি তেলের প্রয়োজন পড়ে না। ইঞ্জিনের সৃষ্ট ধোঁয়া থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জ্বালানি তৈরি করে এটি চলতে পারে।

ঢাকার তাজরীন ফ্যাশনসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শতাধিক শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনা নাড়া দেয় উদ্ভাবক মিজানকে। দ্বিতীয় গবেষণায় হাত দিয়ে তিনি উদ্ভাবন করেন স্বয়ংক্রিয় অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র। বাসাবাড়ি, কলকারখানা বা অফিস-আদালতে আগুন লাগলে পাঁচ থেকে ১০ সেকেন্ডের মধ্যে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয়ে আগুন নেভাতে শুরু করে। এ ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকলেও যন্ত্রটি সচল থাকে।
এই অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রটির বেশ কিছু বিশেষত্ব রয়েছে। এটি অল্প পরিসরেই রাখা যায়। কোনো জায়গায় আগুন লাগলে যন্ত্রটি তাপমাত্রা নির্ণায়ক যন্ত্রের মাধ্যমে আগুনের অবস্থান নিশ্চিত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যালার্ম ও লাইট অন করে দেয়। তারপর একই সঙ্গে সংযুক্ত মোবাইল সেট থেকে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ফোন করে সতর্ক করে দেয়। পাশাপাশি যন্ত্রটি পানির পাম্পে সুইচ অন করে দেয়। আর তা সম্ভব হয় আগুনের অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পাঁচ-সাত সেকেন্ডের মধ্যেই। অতঃপর পানির পাম্পের সঙ্গে সংযুক্ত পাইপের মাধ্যমে আগুনের অবস্থানে পানি পৌঁছে দেয় এবং অসংখ্য ছিদ্রযুক্ত ফাঁপা বলয়ের মধ্য দিয়ে তা আগুনে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে আগুন নিভে যায়।
২০১৫ সালে যশোর জেলা স্কুলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলায় মিজান তাঁর উদ্ভাবিত এই স্বয়ংক্রিয় অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র প্রদর্শন করে প্রথম স্থান অধিকার করেন। পরর্বতী সময়ে এটি বিভাগীয় এবং জাতীয় পর্যায়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলায় যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে।

দেশজুড়ে একটা সময়ে পেট্রলবোমায় জানমালের ব্যাপক ক্ষতি ভয়াবহ আতঙ্ক তৈরি করে। ওই সময় মিজান উদ্ভাবন করেন অগ্নিনিরোধক জ্যাকেট। এই জ্যাকেট পরে যানবাহনের চালক ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা নিরাপদে কাজ করতে পারবেন। আগুনের মাঝে গিয়ে জানমাল রক্ষার কাজে তৎপর হলেও তাঁর শরীরে আগুন স্পর্শ করবে না।

মিজানের চতুর্থ উদ্ভাবন অগ্নিনিরোধ হেলমেট। এটি ব্যবহার করলে দুর্ঘটনায় সৃষ্ট আগুনে শ্বাসনালি পুড়ে যাওয়ার শঙ্কা থাকবে না। তাঁর পঞ্চম উদ্ভাবন হলো প্রতিবন্ধীদের জীবনমান উন্নয়নে মোটরকার।

স্বয়ংক্রিয় সেচযন্ত্র মিজানের ষষ্ঠ উদ্ভাবন। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করলে দূর-দূরান্তের জমিতে সেচ দিতে কৃষককে আর কষ্ট করে ক্ষেতে যেতে হবে না। বাড়িতে বসেই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সেচযন্ত্রটি বন্ধ বা চালু করা যাবে। এমনকি জমিতে প্রয়োজনীয় পানি সেচের পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে যন্ত্রটি বন্ধ হয়ে যাবে। উদ্ভাবক মিজানের সপ্তম উদ্ভাবন দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ফ্যামিলি মোটরকার। এই গাড়ি স্থানীয়দের মাঝে ইতিমধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

মিজানের অষ্টম উদ্ভাবনে রয়েছে পরিবেশ সেফটি যন্ত্র। পরিবেশ রক্ষার্থে এটি বহুমুখী কাজ করে থাকে। যন্ত্রটি বাড়ি, অফিস বা কলকারখানায় ময়লা পরিষ্কারের কাজে ব্যবহার করা যায়। কোনো ধরনের স্পর্শ ছাড়াই এটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে লেগে যায়। এ যন্ত্র উদ্ভাবনের পর ২০১৬ সালের ৫ জুন জাতীয় পর্যায়ে মিজান পরিবেশ পদক লাভ করেন।

জেলা, বিভাগ ও জাতীয় পর্যায়ে মিজান এ পর্যন্ত মোট ১৭টি সাফল্য সনদ ছাড়াও পেয়েছেন অসংখ্য ক্রেস্ট ও সাফল্য পুরস্কার। তাঁর উদ্ভাবিত দেশীয় প্রযুক্তির মোটরকার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এ টু আই প্রকল্পের আওতাভুক্ত হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে ছোট ছোট অ্যাম্বুল্যান্স তৈরির পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে।

মিজানের বিভিন্ন উদ্ভাবনা প্রসঙ্গে খুলনা বিভাগীয় কমিশনার আবদুস সামাদ বলেন, ‘কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে না পড়েও একজন অশিক্ষিত ব্যক্তি বেশ কিছু যন্ত্র উদ্ভাবন করে রীতিমতো সাড়া ফেলেছেন। আমরা তাঁকে উৎসাহিত করেছি। ইতিমধ্যে তিনি ডিজিটাল মেলাসহ জাতীয় পর্যায়ে বেশ কয়েকটি পুুরস্কারও পেয়েছেন। ’

এসব উদ্ভাবনার ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে গবেষক মিজান বলেন, ‘আমার স্বপ্ন দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করে যাওয়া। আমি থেমে নেই। বর্তমানে দূষিত বায়ুশোধন যন্ত্র উদ্ভাবনার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি। আশা করি সফল হব। ’

SHARE THIS

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 coment rios: