১৪ অক্টোবর, ২০১৭

যশোরে আমাদের সিলিকন ভ্যালি - শেখ হাসিনা হাইটেক পার্ক

যশোরে দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কের কাজ প্রায় শেষ। ১৫তলা মূল ভবনের পাশাপাশি আছে থ্রি স্টার মানের আবাসন ও জিমনেশিয়াম সুবিধাসহ ১২তলা ডরমিটরি বিল্ডিং, একটি ক্যান্টিন এবং অ্যাম্ফিথিয়েটার।

একটি ফ্লোর তরুণ উদ্ভাবক বা উদ্যোক্তাদের দেওয়া হচ্ছে বিনা মূল্যে। ঘুরে এসে বিস্তারিত লিখেছেন তুসিন আহম্মেদ

পুকুরের পাশে সবুজ ঘাসের ওপরে একটু পর পর কাঠের বেঞ্চ। সেখানে বসে কোলের ওপর ল্যাপটপ নিয়ে কাজ করছেন কয়েকজন প্রগ্রামার। এমনিতে ভাপসা গরম পড়লেও পুকুরপাড়ে ঝিরিঝিরি বাতাস কিছুটা আরাম দিচ্ছে। মনোযোগ নিয়ে বিদেশি গ্রাহকের কাজ করছেন তাঁরা। একটু পর পর বেঞ্চের পাশে রাখা চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন। যশোরের বেজপাড়ায় আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের অপেক্ষায় থাকা শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কের ভেতরে প্রবেশ করতেই এমন দৃশ্য চোখে পড়ল। একজন কাজ শেষে আড়মোড়া ভাঙার জন্য দাঁড়াতেই এগিয়ে গেলাম। ভবন রেখে বাইরে বসে কাজ কেন—জানতে চাইলে বললেন, ‘সফটওয়্যার পার্ক এখনো আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন না হলেও একাধিক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে।

একটিতে কাজ করি আমি। আরো কিছু প্রতিষ্ঠান দ্রুতই তাদের কার্যক্রম চালু করবে। এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের জন্য এখন চাকরি মেলা চলছে। ভবনে তাই হাজার হাজার লোক আসছে আজ। আগ্রহ নিয়ে আমাদের অফিস দেখছে। তাই কাজে মনোযোগ দেওয়া যাচ্ছে কম। ক্লায়েন্ট তো আর এত সব বুঝবে না। তারা ঠিক সময়ে কাজ চাইবে। তাই এখানে বসে কাজ শেষ করছি। অবশ্য মনোরম এই পরিবেশে কাজ করতে ভালোই লাগছে। এখানকার পরিবেশ অনেকটা সিলিকন ভ্যালির মতোই খোলামেলা। গাছপালাও আছে। ’

যেভাবে যাত্রা শুরু

কথা হলো প্রকল্প পরিচালক জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে। তিনি জানান, ২০১০ সালের ২৭ ডিসেম্বর যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস উদ্বোধনের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যশোরে আন্তর্জাতিক মানের একটি আইটি পার্ক স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। দীর্ঘ যাচাই-বাছাইয়ের পর ২০১৪ সালের ২৫ এপ্রিল যশোরের বেজপাড়া এলাকায় এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। আর ১২ একর ১৩ শতাংশ জায়গার ওপর মূল কাঠামোর কাজ শুরু হয় ২০১৫ সাল থেকে। মাত্র দুই বছরেই বেশির ভাগ কাজ শেষ। এখন অপেক্ষা আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের।

রাজধানী ঢাকার সঙ্গে যশোরের সড়ক, রেল ও আকাশপথে যোগাযোগব্যবস্থা আছে। প্রকল্পে মোট ব্যয় হচ্ছে ৩০৫ কোটি টাকা। যার মধ্যে ২৫৩ কোটি টাকা সরকার দিয়েছে। বাকি ৫২ কোটি টাকা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এখানে প্রায় ২০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে।

পার্কে যা আছে

১৫তলা মূল ভবন ভূমিকম্প প্রতিরোধক কম্পোজিট কাঠামোতে (স্টিল ও কংক্রিট) নির্মিত। মোট জায়গা দুই লাখ ৩২ হাজার বর্গফুট। এই ভবনে রয়েছে ফাইবার অপটিক ইন্টারনেট সংযোগ। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের জন্য ৩৩ কেভিএ বৈদ্যুতিক সাবস্টেশনও রয়েছে। সঙ্গে রয়েছে দুই হাজার কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটর। পার্কের মূল ভবনের সামনে পাঁচ একরের একটি বিশাল জলাধার রয়েছে। যেখানে স্বচ্ছ পানিতে থাকবে দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির মাছ। মূল ভবনের দক্ষিণ পাশে রয়েছে সবুজ বেষ্টনী। কর্মীদের জন্য হাঁটার পথ আছে এখানে। পার্কে একটি ডাটা সেন্টারও আছে।

নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বিনা মূল্যে জায়গা

দেশে তথ্য-প্রযুক্তিভিত্তিক অনেক নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রধান সমস্যা পর্যাপ্ত বিনিয়োগ। আইডিয়া ভালো হলেও জায়গার অভাবে শুরুতেই ঝরে যায় অনেক উদ্যোগ। এ সমস্যা সমাধানে সফটওয়্যার পার্কে বিনা মূল্যে জায়গা দেওয়া হবে নতুন উদ্যোক্তাদের। মূল ভবনের ১৩তলায় ১৪ হাজার ৫০০ বর্গফুট জায়গা রাখা হয়েছে এ ধরনের উদ্যোগের জন্য। ৩০টির মতো উদ্যোগকে এখানে জায়গা দেওয়া হবে। তাদের অফিসের সাজসজ্জাও করে দেবে হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ। উদ্যোক্তারা শুধু লোকবল নিয়েই কাজ শুরু করে দিতে পারবে। এর মধ্যে দুটি উদ্যোগ কাজ শুরু করেছে এখানে। বাকিগুলো যাচাইয়ের জন্য দ্রুতই একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে বলে জানান জাহাঙ্গীর আলম।

চমৎকার ক্যান্টিন

সুন্দর বাংলো বাড়ির মতো ডিজাইনের তিনতলা ভবন। এটাই শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কের ক্যান্টিন। দুই তলাবিশিষ্ট ক্যান্টিনে একত্রে ৫০০ মানুষ বসে খেতে পারবে। রয়েছে সুন্দর আলোকসজ্জা, আর পুরো ক্যান্টিনের মাঝে রয়েছে বেশ বড় আকৃতির আকর্ষণীয় একটি বাতি। এ ভবনেরই ওপরের তলায় রয়েছে অ্যাম্ফিথিয়েটার।

আছে থাকার ব্যবস্থা

সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের জন্য ১২ তলাবিশিষ্ট ডরমিটরি রয়েছে পার্কে। পুকুরের পাশেই ডরমিটরিটি থাকায় রুম থেকে পুকুরের সৌন্দর্য উপভোগ করা যাবে। ভবনটির প্রতিটি ফ্লোরের আয়তন আট হাজার বর্গফুট। ৮০টি রুম রয়েছে এতে।

যেভাবে জায়গা পাওয়া যাবে

সফটওয়্যার পার্কে এ পর্যন্ত অগ্নি সিস্টেমস, দোহাটেক, অগমেডিক্স বাংলাদেশ, এমসিসি, কাজি আইটি, ফিফোটেক, ই-জেনারেশন, বাক্য, ডিজিকন, ওয়ালটনসহ ৩৫টি প্রতিষ্ঠানকে জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। নতুন প্রতিষ্ঠান জায়গা বরাদ্দ পেতে হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করতে হবে। আবেদন ফরমটি হাইটেক পার্কের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট (http://www.bhtpa. gov.bd/) থেকে ডাউনলোড করে পূরণ করে হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে হবে। যাচাই-বাছাই শেষে পাওয়া যাবে জায়গা।

বাছাইয়ের জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ থেকে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে।

জায়গা বরাদ্দ পেতে সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নতমানের কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স, সরকারকে নিয়মিত ভ্যাট-ট্যাক্স প্রদানসংক্রান্ত কাগজপত্র ঠিকঠাক থাকা চাই।

চূড়ান্ত হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে মাসে ভাড়া হিসেবে দিতে হবে বর্গফুটপ্রতি ১০ টাকা।

বর্তমানে প্রায় ২০টির মতো প্রতিষ্ঠানের আবেদন জমা আছে। যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার কাজ শেষে সেখান আরো ১০-১৫টি প্রতিষ্ঠানকে জায়গা দেওয়া হবে।

SHARE THIS

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 coment rios: