২৭ অক্টোবর, ২০১৭

যশোর-৩ আসনে আ’লীগে ত্রিমুখী মনোনয়ন লড়াই, বিএনপিতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী তরিকুল

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যশোর-৩ আসনে আওয়ামী লীগে ত্রিমুখী মনোনয়ন লড়াই শুরু হয়েছে। এ সদর আসনে তিনজনই হেভিওয়েট প্রার্থী। সবশেষ ২০১৪ সালে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত কাজী নাবিল আহমেদকে এবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে হলে নির্বাচনের আগেই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে হবে। বিগত নির্বাচনে মনোনয়নবঞ্চিত সাবেক এমপি খালেদুর রহমান টিটো ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদার দু’জনেই তৃণমূল ও কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন। জেলার সবচেয়ে মর্যাদার এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে যিনিই প্রার্থী হন না কেন তাকে দীর্ঘ দিনের পরীক্ষিত বিএনপি নেতা তরিকুল ইসলামকে মোকাবেলা করতে হবে। দক্ষিণবঙ্গে বিএনপির অভিভাবক হিসেবে পরিচিত দলের স্থায়ী কমিটির এই সদস্য। যশোর-৩ আসনে বিএনপির মনোনয়ন যুদ্ধে তরিকুল ইসলামের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। তবে তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ। শেষপর্যন্ত তিনি যদি নির্বাচন না করেন তখনই বিকল্প চিন্তা করা হবে। সেক্ষেত্রে বিএনপির মনোনয়ন দাবিদার জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু। তবে তরিকুল পরিবারের বাইরে মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।যশোর সদর উপজেলার বসুন্দিয়া বাদে ১৪টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে যশোর-৩ আসন। ৯০ পরবর্তী ছয়টি সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী চারবার ও বিএনপি দুইবার নির্বাচিত হয়েছেন।

১৯৭৩ সালে এ আসনে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের রওশন আলী। ১৯৭৯ সালে বিএনপির তরিকুল ইসলাম, ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টির খালেদুর রহমান টিটো এবং ১৯৮৮ সালে জাসদের আবদুল হাই এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগের রওশন আলী, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপির তরিকুল ইসলাম, ১৯৯৬ সালের ১২ জুন আওয়ামী লীগের আলী রেজা রাজু, ২০০১ সালে বিএনপির তরিকুল ইসলাম, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের খালেদুর রহমান টিটো ও ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের কাজী নাবিল আহমেদ বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।
দশম সংসদ নির্বাচনে কাজী নাবিল আহমেদ ফাঁকা মাঠে গোল দিলেও এবার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। এবার সব দলের অংশগ্রহণে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই বিবেচনায় এ আসনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম হবেন শক্তিশালী প্রার্থী। আওয়ামী লীগের যিনিই প্রার্থী হন না কেন দলের সবাইকে একাট্টা হয়ে মাঠে নামতে হবে বিএনপির তরিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে। তৃণমূলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ও ক্লিন ইমেজের প্রার্থী ছাড়া তরিকুলের সঙ্গে লড়াই হবে চ্যালেঞ্জিং।

আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান এমপি কাজী নাবিল আহমেদ, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদার, সাবেক এমপি খালেদুর রহমান টিটো। এই নেতাদের ঘিরে স্থানীয় রাজনীতিতে গ্রুপিং সক্রিয় রয়েছে। বিগত নির্বাচনে শাহীন চাকলাদারের নাম জোরেশোরে শোনা গেলেও শেষপর্যন্ত নাবিল আহমেদ মনোনয়ন পান। মনোনয়ন না পাওয়ায় চাকলাদার অনুসারীদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায় তখন। তবে হাল ছাড়েননি শাহীন চাকলাদার। জাতীয় পার্টি থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে ২০০৮ সালে নৌকার মনোনয়ন নিয়ে এমপি হন খালেদুর রহমান টিটো। পরবর্তীতে সেই নৌকার মনোনয়ন ধরে রাখতে পারেননি তিনি। আসন্ন একাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে চান আওয়ামী লীগের প্রবীণ এই নেতা। টিটো-তরিকুল বাল্যবন্ধু হলেও নির্বাচনী মাঠে তারা প্রতিদ্বন্দ্বী। তরিকুলের সঙ্গে লড়তেও প্রস্তুত টিটো।

জানতে চাইলে খালেদুর রহমান টিটো যুগান্তরকে বলেন, ‘দীর্ঘ দিন ধরে রাজনীতি করছি, তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক আজকের নয়। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের ভালোবাসায় এখনও রাজনীতির মাঠে আছি। জননেত্রী শেখ হাসিনা নৌকার মনোনয়ন দিলে বিএনপির প্রার্থীর সঙ্গে লড়াইয়ে প্রস্তুত আছি।’

আগামী নির্বাচন নিয়ে কথা হয় জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদারের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন ‘গতবার এ আসনে ভোট হয়নি, নেত্রী যাকে মনোনয়ন দিয়েছেন- সেটি কোনো বিষয় নয়। কিন্তু এবার ২০ দলের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হবে। এজন্য তৃণমূলের প্রতিনিধিকে নৌকার মনোনয়ন দিতে হবে। এমপি হওয়া আর তৃণমূলের রাজনীতি করা এক নয়। তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক যার আছে, জনগণ তাকেই নৌকার প্রার্থী হিসেবে দেখতে চান। তৃণমূলের প্রতিনিধি হিসেবে আমি এবার মনোনয়ন পাব বলে আশাবাদী।’

জানতে চাইলে বর্তমান এমপি কাজী নাবিল আহমেদ যুগান্তরকে বলেন ‘গতবার দেশের সার্বিক পরিস্থিতির কারণে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছি। এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনকে স্বাগত জানাই। এজন্য প্রস্তুত আছি। আমার বিশ্বাস জনগণ আমাকে মূল্যায়ন করবেন। আওয়ামী লীগ বৃহৎ দল, অনেকে মনোনয়ন চাইতে পারে। আমাদের নেত্রী সঠিক সিদ্ধান্তই নেবেন।’

কাজী নাবিল আহমেদ বলেন, ‘বর্তমান সরকারের আমলে দেশে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। যশোর সদর আসনেও অনেক উন্নয়নকাজ হয়েছে। মানুষের চাহিদা অনুযায়ী উন্নয়নমূলক কাজ করতে পেরেছি। সাধ্যমতো কাজ করায় আমার দৃঢ়বিশ্বাস আমি মনোনয়ন পাব। আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে এলাকায় ব্যাপক গণসংযোগ ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড তত্ত্বাবধান করার জন্য যশোরের মানুষ মূল্যায়ন করবেন।’ এদিকে বিএনপিতে তরিকুল ইসলাম এবারও প্রার্থী। তবে এবার তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে স্থানীয় নেতাকর্মীরা চিন্তিত। শেষপর্যন্ত তিনি যদি নির্বাচন নাই করেন তাহলে তরিকুল ইসলামের পরিবারের কোনো একজনকে মনোনয়ন দেয়া হতে পারে। সেক্ষেত্রে স্ত্রী অধ্যাপিকা নার্গিস বেগম কিংবা ছেলে বিএনপির খুলনা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের সম্ভাবনা বেশি। এর বাইরে তরিকুল ইসলামের বিকল্প হিসেবে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সাবেরুল হক সাবুও তালিকায় রয়েছেন।

আগামী নির্বাচন নিয়ে কথা হয় তরিকুল ইসলামের ছেলে অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘তিনি (তরিকুল) যতদিন আছেন এ আসনে নির্বাচন করবেন- এটাই নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা। অন্য কাউকে নেতাকর্মীরা ভাবছেন না।’

তরিকুল ইসলাম কোনো কারণে নির্বাচন না করলে কে হবেন বিএনপির প্রার্থী- এমন প্রশ্নের জবাবে অনিন্দ্য ইসলাম বলেন, ‘আমরা এখন এটা নিয়ে ভাবছি না। তিনি যতদিন আছেন, ততদিন বিকল্প কোনো ভাবনা নেই।’

জানতে চাইলে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সাবেরুল হক সাবু বলেন, ‘আমরা মনে করছি তরিকুল ইসলামই প্রার্থী হবেন। তিনিই আমাদের অভিভাবক। তিনি নির্বাচন করবেন বলে আমাদের বিশ্বাস। যদি কোনো কারণে তিনি (তরিকুল) নির্বাচন না করেন, তাহলে তার আস্থাভাজন কর্মী হিসেবে তিনি আমার নাম প্রস্তাব করবেন- এটা আমার বিশ্বাস। তখন আমি নির্বাচন করব।’

এছাড়াও জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে মাহবুবুল আলম বাচ্চু ও জাহাঙ্গীর আলমের নাম শোনা যাচ্ছে জোরেশোরে। যদিও জেলা জাতীয় পার্টি তাদের প্রার্থী হিসেবে জাহাঙ্গীর আলমের নাম কেন্দ্রে প্রস্তাব পাঠিয়েছে বলে জানা গেছে।

যুগান্তর

SHARE THIS

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 coment rios: