নাটক সিনেমার ভাঁড়ামিতে সামাজিক বিপর্যয়

মনসুর সাহেব চাকুরী থেকে অবসরপ্রাপ্ত মানুষ। সারাদিন ঘরেই কাটে। সেদিন বিকেলে তিনি ইউটিউবে খুঁজে খুঁজে পুরনো বাংলা নাটক দেখছিলেন। ছোট মেয়েট...

মনসুর সাহেব চাকুরী থেকে অবসরপ্রাপ্ত মানুষ। সারাদিন ঘরেই কাটে। সেদিন বিকেলে তিনি ইউটিউবে খুঁজে খুঁজে পুরনো বাংলা নাটক দেখছিলেন। ছোট মেয়েটার বয়স আঠারো। সে একবার এদিকে উঁকি দিয়ে গেলো। বাবা কী নাটক দেখছেন একটু আগ্রহই হচ্ছে। কিছুক্ষণ দাঁড়ালো সে। তারপর হাসতে হাসতে বললো– বাবা, কী দেখো এইসব? এইসব তো তোমরা তখনই দেখছো। এখন নতুন ছেলেমেরা কী দারুণ কাজ করতেছে। এক কথায় অসাম। আর এসব খেয়েছি, গিয়েছি, কী সব ল্যাঙ্গুয়েজ? খাইছস, বইছস, এইরকম কথ্য ভাষায় নাটক দেখো। মজা পাইবা। আর বাবা শোনো, মমিসিং-এর নাটক দেখো, আবেগে কাইন্দাইলচি। পাবনা সিরাজগঞ্জের নাটক দেখতে পারো। সব মুখ বাঁকা আর পা বাঁকা লাল আর হলুদ প্যান্ট পরা নায়ক, হাসতে হাসতে শেষ আমি। দেখবা বাবা?’ মেয়ের কথা শুনে দম নিলেন মনসুর সাহেব। তারপর বললেন ‘ছাদে যাই চল, তোর সাথে কথা আছে’।
মনসুর সাহেব তাঁর মেয়েকে বুঝাচ্ছেন। এই যে লাল হলুদ প্যান্ট, তার উপর কালো চশমা, আবার ময়মনসিংহ, পাবনা আর বরিশাল, নোয়াখালীর ভাষায় এত নাটক হচ্ছে, কী পাচ্ছিস তোরা? একে তো ভাষার বিকৃতি, আবার উদ্ভট সব পোশাক। আঞ্চলিক ভাষায় নাটকে তো সেই অঞ্চলের ভাষাকে বিকৃত করা হচ্ছেই, পাশাপাশি উদ্ভট পোশাক পরিয়ে সেই এলাকার কৃষ্টি-কালচার ও সভ্যতাকে ভীষণ ছোট করে দেখা হচ্ছে। তুই কয়টা নাটক দেখেছিস এবারের ঈদে? সব ইউটিউবের ভরসায় থাকিস আর নাটক টেনে টেনে দেখিস। অথচ আমরা একটা দৃশ্যের জন্য কত রকম প্রস্তুতি নিয়ে থাকতাম। এখন যেসব নাটক হচ্ছে, তা দেখে হাসি পাচ্ছে খুব? কিন্তু সেই হাসির পরে সেই রেশ থাকছে কতক্ষণ? আর আমরা হুমায়ূন আহমেদের যেসব নাটক দেখে হাসতে হাসতে পড়ে যেতাম, সেসব নাটকে কোনো অভিনেতা অভিনেত্রীকে তো সঙ সেজে অভিনয় করতে হয় নাই। সব নাটকের শেষে একটা দারুণ ম্যাসেজ থাকতো।’ বাবার  কথা শেষ না হতেই চরম বিরক্ত হয়ে ছাদ থেকে নেমে গেলো মেয়েটা।
মনসুর সাহেব ও তার মেয়ের টেলিভিশন নাটক নিয়ে দুরকমের ভাবনাটা একেবারেই ফেলনা নয়। এরকম বা কাছাকাছি চিত্র সর্বত্র। ঈদের সময় প্রচারিত নাটকের সংখ্যা সব মিলিয়ে একশর অনেক বেশি। এই যে এক ঈদেই এতো নাটক, কী থাকছে সেখানে? শেষ পর্যন্ত কয়টা নাটক বেরিয়ে আসছে? কয়টা নাটকের গল্প নিয়ে এখানে সেখানে আলোচনা হচ্ছে? এসব প্রশ্নের ভিড়ে কিছু কথা প্যাঁচিয়ে যায়।
আঞ্চলিক ভাষায় নাটক নির্মাণ হলো । ধারাবাহিক নাটক। সেটা প্রায় দেড় যুগ অথবা কম করে হলেও এক যুগ। একেবারেই হাসির নাটক। নিছক বিনোদন থাকলেও সেইসব টুকরো টুকরো গল্পের নাটক থেকে দর্শক অনেককিছু পেয়েছে। কিন্তু সেই একই প্রেক্ষাপট, একই রকম গল্প, একই রকম কস্টিউম আর একই সংলাপের ভিড়ে হাসির ব্যাপারটা বিরক্তিতে চলে গেছে। সবচেয়ে বড় হতাশার জায়গা তৈরি হয়েছে যেখানে সেটা হচ্ছে, সময়ের অনেক তুখোড় অভিনেতা স্ক্রিপ্ট আর সংলাপ না পড়েই হয়তো এসব কাজে যুক্ত হচ্ছেন। জোর করে হাসাবার চেষ্টা করছেন। নিজের মেধার অপচয় কাকে বলে এইসব গুণী অভিনেতার এমন সব কাজ দেখলেই তা স্পষ্ট হয়ে আসে। আরও ভয়ংকর ব্যাপার ঘটছে, একই নাটকের সিকুয়াল তৈরি করতে করতে ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে একদম। সর্বশেষ সিকুয়াল দেখতে গিয়ে না পাওয়া যাচ্ছে প্রাণ খুলে হাসবার মতো ব্যাপার, না পাওয়া যাচ্ছে দারুণ কোনো ম্যাসেজ। আছেন ভালো নির্মাতাও। তারা নিজেরাও ঈদে বা বিশেষ দিনে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে হুটহাট তৈরি করছেন দায়সারা নাটক। এতো কাজের মধ্যে সবচেয়ে বড় ক্রাইসিস দেখা যাচ্ছে গল্পে। সম্ভবত এই গল্পের ক্রাইসিস শুরু হয়েছে কোনো বিচ্ছিন্ন সিন্ডিকেটের কারণে। গল্প যেরকমই হোক, শর্তারোপে থাকে ‘অমুকের গল্প হতে হবে’। সেই অমুক কী লিখে দিচ্ছে, সেদিকে মনোযোগের চেয়ে তড়িঘড়ি নাটক তৈরি করাটাই বড় হয়ে গেছে। দর্শক এখন গালমন্দ দিচ্ছে। প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। উল্টো দর্শকদের ব্যাপারে নির্মাতাদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দর্শক ভালো কাজ খাচ্ছে না। এই যে তাদের খাচ্ছে না বলাটা, এর ভেতরেই তো সভ্যতা বিবর্জিত কথার উচ্চারণ। নাটক কি খাওয়ার বিষয়?
বাংলা নাটকের এমন বিপর্যয়ে গোপনে খোঁজ নিলে দেখা যায় অন্য রহস্য। এজেন্সির চাপেই মূলত এইসব বস্তাপচা গল্পের নাটক তৈরি হচ্ছে। বাজেট অনেক। চিত্রগ্রহণ, সম্পাদনা, লোকেশন আর পাত্র পাত্রীরাও সব ঝকঝকে। কিন্তু গল্পে নেই কিছুই। কিছুই নেই অভিনয়ের ভেতরেও। এই এজেন্সির বেঁধে দেয়া শর্তে নাটক নির্মাণ বেড়ে গেলে পতনের কোথায় যাবে,  তা অনুমান করা যায় ইউটিউব নির্ভর নানান গল্পের উঁকিঝুঁকিতে। মহামারির মতো এগিয়ে আসছে ভাঁড়ামি আর অশ্লীলতা। খুব দ্রুত খোলামেলা হয়ে যাচ্ছে সব। গল্পের দিকে নজর নেই, সংলাপ আর অভিনয়েও গুরুত্বহীনতা, বাংলা নাটকের চিরায়ত সৌন্দর্যকে একেবারে ম্লান করে দিচ্ছে প্রায়। পরিবারের মধ্যে কে কার সাথে কেমন আচরণ করবে, বন্ধু বন্ধুর সাথে কিভাবে মিশবে, স্বামী স্ত্রী অথবা প্রেমিক প্রেমিকার ভাষা কেমন হবে, এসবের কোনো বালাই নেই, শিষ্টাচারের দিকে তাচ্ছিল্যের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শুরু হয়েছে হাত ধরে অসভ্যতা শেখানোর পাঁয়তারাও।
এ প্রসঙ্গে নাট্যনির্মাতাদের সংগঠন ‍ডিরেক্টরস গিল্ড-এর সভাপতি গাজী রাকায়েত বলেন, ‘তরুণ অনেক নির্মাতাই এখন ভালো কাজ করছেন। কিন্তু অনেক আজেবাজে কাজের ভেতর ভালোটা হারিয়ে যাচ্ছে। নাটকে ভাষা বিকৃতির বিষটি খুবই আপত্তিকর। কেননা, মিডিয়া একটি দেশের মানুষের রুচিবোধ বিনির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা রাখে। সুতরাং এখানে প্রমিত বাংলার ব্যবহারই শ্রেয়। পাশাপাশি অল্প সময়ে অধিক কাজ নাটকের মানহীনতার জন্য অনেকাংশে দায়ী। টেলিভিশন কর্তৃপক্ষের উচিত বিষয়টিকে কঠোরভাবে দেখা। একইসাথে আমাদের নির্মাতা এবং শিল্পীদেরও এ বিষয়ে সাবধান হতে হবে। শুধু নাটক নয়, অন্যান্য অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও এটি সমানভাবে প্রযোজ্য।’
নাট্যনির্মাতা বদরুল আনাম সৌদ বলেন, ‘অশ্লীলতার কাছে আমরা প্রতিদিন নিজেদের বিক্রি করেছি। দর্শক কী চায়, সেটা নিশ্চিত না হয়ে আমরা মনে করছি দর্শক এসব চায়। আমরা একটু একটু করে সস্তা ও অশ্লীল হতে শুরু করলাম। আমরা ভেবে নিচ্ছি দর্শক শিক্ষিত না, যদি দর্শক শিক্ষিত না হয়ে থাকে, তাদের শিক্ষিত করার দায়িত্ব তো আমাদেরই। আমরা হয়তো তার প্রত্যাশার দশভাগ দিতে পারব না, তাহলে অন্তত দুইভাগ দিই, তা না করে আমরা শূন্যেরও কমে নিয়ে এসেছি। আমরা আসলে ব্যক্তিগতভাবে কেউ এই জায়গায় নিয়ে আসি নাই, সবাই মিলে এই জায়গায় নিয়ে এসেছি। এই অবস্থা থেকে উত্তরণ আমাদেরকেই ঘটাতে হবে। ভালো গল্প বলতে হবে। ভালো নাটক তৈরি করতে হবে।’
এ বিষয়ে নাট্যপ্রযোজক তুহিন বড়ূয়া বলেন, ‘একটা সময় শুদ্ধভাষায় নাটক হতো। সেখান থেকে আমরা ভাষার ব্যবহার শিখতাম। কিন্তু ২০০২, ৩, ৪-এর দিকে নাটকে ভাষা বিকৃতির প্রবণতা শুরু হয়। তথাকথিত টিআরপির কারণে যা এখন চরম আকার ধারণ করেছে। কেউ কেউ সস্তা, সাময়িক জনপ্রিয়তার লোভে আমাদের সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। আসলে হাসির নাটক হচ্ছে মিষ্টির মতো। কিন্তু কমেডির নামে যা-তা করা কোনোভাবেই ঠিক নয়। নির্মাতাদের ভালো নাটক তৈরি করতে হবে। চ্যানেলগুলোকেও নাটক নির্বাচনের ক্ষেত্রে এ বিষয়গুলোতে আন্তরিক হতে হবে। জাতীয় মিডিয়াতে শুদ্ধ-প্রমিত ভাষার নাট্যচর্চা খুবই জরুরি।’
এই যে প্রবল মহামারির আশংকা, বাংলা নাটকের ভবিষ্যৎ কী? এরমধ্যেও কেউ কেউ ঠিক প্রশংসা কুড়াচ্ছেন ভালো নাটক নির্মাণে, ভালো অভিনয়েও। এখনও এদেশের দর্শক ভালো গল্প পেলে লুফে নেয়, ভালো অভিনয় দেখলে প্রাণ খুলে হাসে, মুখ লুকিয়ে কাঁদে সেরকম অভিনয় দেখে। এজেন্সির ছুঁড়ে দেয়া ঘোলা স্রোতের শর্তারোপে আর কোনো মানহীন গল্প নয়, নয় আর কোনো তাড়াহুড়োর ভাঁড়ামি নির্ভর অভিনয়ও। এদেশের দর্শকদের প্রত্যাশা এখনও এখানেই আছে।

COMMENTS

Mountain View
নাম

অপরাধ বার্তা অভয়নগর অর্থনীতি আন্তর্জাতিক ইতিহাস/মুক্তিযুদ্ধ ইলেক্ট্রনিক্স ইসলাম ঐতিহ্য ঐতিহ্য/সংস্কৃতি কলাম কৃষি কৃষি বার্তা কেশবপুর খেলাধুলা গ্যালারী চাকরির খবর চাকুরী চুয়াডাঙ্গা চৌগাছা জাতীয় ঝিকরগাছা ঝিনাইদহ টিপস তথ্য প্রযুক্তি দর্শনীয় স্থান নড়াইল নিবন্ধ পরিবেশ প্রকৃতি/পরিবেশ প্রতিবেদন প্রবাস প্রশাসন ফেসবুক বাঘারপাড়া বিনোদন বিশেষ খবর বেনাপোল ব্যক্তিত্ব ব্যবসা/বানিজ্য ব্রেকিং নিউজ ভর্তি পরীক্ষা ভিডিও ভ্রমন মনিরামপুর মাগুরা মুক্তিযুদ্ধ যশোর যশোর সদর রাজনীতি রান্না লাইফ স্টাইল শার্শা শিক্ষাঙ্গন সংবাদ সংস্কৃতি সম্পাদকীয় সর্বশেষ সাফল্য সারাদেশ সাহিত্য সিনেমা স্বাস্থ্য Breaking Feature Greater Jessore Tips
false
ltr
item
যশোর নিউজ ২৪: Jessore News 24:: নাটক সিনেমার ভাঁড়ামিতে সামাজিক বিপর্যয়
নাটক সিনেমার ভাঁড়ামিতে সামাজিক বিপর্যয়
https://1.bp.blogspot.com/-rceRJ82tjsU/Wbo2zdEMbiI/AAAAAAAADJ4/fZYfQzkNXPQr7ywmEdXe7MrXqy-vOlerwCLcBGAs/s320/natok.jpg
https://1.bp.blogspot.com/-rceRJ82tjsU/Wbo2zdEMbiI/AAAAAAAADJ4/fZYfQzkNXPQr7ywmEdXe7MrXqy-vOlerwCLcBGAs/s72-c/natok.jpg
যশোর নিউজ ২৪: Jessore News 24:
http://www.jessorenews24.com/2017/09/blog-post_59.html
http://www.jessorenews24.com/
http://www.jessorenews24.com/
http://www.jessorenews24.com/2017/09/blog-post_59.html
true
286737489812364167
UTF-8
Not found any posts VIEW ALL Readmore Reply Cancel reply Delete By Home PAGES POSTS View All RECOMMENDED FOR YOU LABEL ARCHIVE SEARCH ALL POSTS Not found any post match with your request Back Home Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS CONTENT IS PREMIUM Please share to unlock Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy