৭ এপ্রিল, ২০১৭

সিরিয়া যুদ্ধে তুরস্কের পরবর্তী ধাপ কি?

‘উত্তর সিরিয়ায় সামরিক অভিযান ‘ইউফ্রেটিস শিল্ড’-এর সফল সমাপ্তি হয়েছে।’ ২৯শে মার্চ তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিরিম এ ঘোষণা দেন। সে সঙ্গে ভবিষ্যতে আরো আন্তঃসীমান্ত অভিযানের ইঙ্গিত দেন তিনি। তুরস্কের বিশ্লেষকরা আল-জাজিরাকে বলেছেন, ইলদিরিমের এ ঘোষণায় বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। তুরস্ক শিগগিরই ওই অঞ্চল ছাড়বে বলে তারা মনে করেন না। ইস্তাম্বুলের গ্লোবাল সোর্স পার্টনার্সের রাজনৈতিক বিশ্লেষক আতিল্লা ইয়েসিলাদা বলেন, ‘ইলদিরিমের ঘোষণা ছিল স্রেফ সেখানকার পরিস্থিতির স্বীকৃতি। এ মুহূর্তে উত্তর সিরিয়ায় কূটনৈতিক বা সামরিক কোনো ক্ষেত্রেই তেমন কিছু করার সুযোগ তুরস্কের নেই।
২১৬ দিনের ‘ইউফ্রেটিস শিল্ড’ অভিযানের শুরুতে তুর্কী বাহিনী সীমান্তবর্তী শহর জারাবলুসের নিয়ন্ত্রণ নেয়। সীমান্তের আনুমানিক ১০০ কিলোমিটার ব্যাপ্তি থেকে হঠিয়ে দেয় আইসিস যোদ্ধাদের। আইসিস ও কুর্দী বাহিনীর বিরুদ্ধে এই অভিযান শুরু হয় গত আগস্টের শেষে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে তুরস্ক ঘোষণা দেয় যে তারা আইএসের শক্ত ঘাঁটি আল বাবের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।
তুর্কী নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবানচি বিশ্ববিদ্যালয়েল ইস্তাম্বুল পলিসি সেন্টারের রিসার্চ ফেলো মেতিন গুরকান বলেন, ‘কার্যত ইউফ্রেটিস শিল্ডের সমাপ্তি ঘটেছে প্রায় এক মাস আগে যখন তুরস্কের প্রভাবপুষ্ট জারাবলুস, আল রাই ও আল বাব মধ্যবর্তী ত্রিভুজ এলাকা ঘিরে ফেলে মার্কিন, রাশিয়ান ও সিরিয় বাহিনী। পূর্ব দিক ঘিরে ফেলে আমেরিকান মেরিনরা। পশ্চিম দিক রাশিয়ান সেনা আর দক্ষিণ পাশ সিরিয়ান সরকারি বাহিনী।’
মার্চের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র আল বাবের পূর্বদিকের মানজিব শহরের অদূরে অপেক্ষাকৃত ছোট একটি বাহিনী পাঠায়। গুরকানের ভাষ্য এ ঘটনার ফলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সিরীয় শহরটি থেকে কুর্দি বাহিনীতে হঠিয়ে দেয়া এবং পূর্ব দিকে আরও প্রভাব বিস্তারর করার তুর্কী পরিকল্পনার ইতি ঘটে। গুরকান আরও বলেন, ‘আর রাশিয়া যখন ঘোষণা দিল যে তারা কুর্দি বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিতে আফরিনে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করছে, আঙ্কারা তখন উপলব্ধি করলো তারা আর পশ্চিমেও অগ্রসর হতে পারবে না।’
বিশ্লেষকদের মতে বৈশ্বিক এই শক্তিদের সঙ্গে ‘লেনদেনমূলক জোট’ গঠনে তুরস্কের ব্যর্থতাই ইউফ্রেটিস শিল্ড অভিযানের ইতি ঘটেছে। ইয়েসিলাদা বলেন, ‘তুর্কী সরকার রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের সঙ্গে লেনদেনের জোট গঠন করেছে তবে সিরিয়ায় এ দুই দেশের কোন দেশকে তাদের পক্ষে টানতে ব্যর্থ হয়েছে।’ যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া উভয়ই সিরিয়ান কুর্দিশ পিপলস প্রোটেকশন ইউনিট (ওয়াইপিজি) ও তাদের আরব মিত্রদের সঙ্গে অব্যাহতভাবে সম্পর্ক দৃঢ় করে চলেছে।
আঙ্কারা বিশ্বাস করে তারা এটা করছে তুরস্ককে বলি দিয়ে। তাদের ভাস্য ওয়াইপিজি সরাসরি পিকেকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। পিকেকে সশস্ত্র একটি গোষ্ঠী যারা তুরস্কে চার দশক ধরে রক্তাক্ত সংঘাতে লড়ছে। ইয়েসিলাদা বলেন, ‘কাজেই তুরস্ক এখন এমন পরিস্থিতিতে যেখানে ইউফ্রেটিস নদীর পশ্চিমে রাশিয়ানদের নিয়ন্ত্রণ, আর পূর্ব দিকের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের। আর দুপক্ষের এক পক্ষও ওই অঞ্চলে তুরস্কের প্রয়োজন ও স্বার্থের প্রতি সহযোগিতামূলক নয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘আসল কথা হলো অভিযানটি তার স্বাভাবিক সীমায় পৌঁছেছে। তুরস্ক উপলব্ধি করেছে যে তারা ওই এলাকায় যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও সিরিয়ান শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়া ব্যতীত আর কিছু অর্জন করতে পারবে না। তবে, এর অর্থ এটাও নয় তুরস্ক পুরোপুরিভাবে সিরিয়া ছাড়তে প্রস্তুত। সিরিয়াতে কাজ শেষ এই কথা বলার সুযোগ তুরস্কের নেই।’
বিশ্লেষকরা আরো মনে করছেন যে সিরিয়ায় এক সন্ধিক্ষণে রয়েছে তুরস্ক। তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে তারা উত্তর সিরিয়ার সেনাদের রাখবে কিনা। গুরকান বলেন, ‘তুর্কী সরকার এটা এখনও স্পষ্ট করেনি। তবে, সবদিক থেকে এমন ইঙ্গিতই মিলছে যে তুরস্ক সিরিয়ার থাকতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ইউফ্রেটিস শিল্ডের ইতি ঘটার পরও। আন্তঃসীমান্ত আরেকটি অভিযানের সুযোগ পাওয়ার অপেক্ষায় তুরস্ক। ততক্ষণ দেশটি আইসিসের কাছ থেকে দখল নেয়া শহরগুলোর পুনর্গঠন শুরু করতে যাচ্ছে।’
২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে তুরস্ক সিরিয়ান শরণার্থীদের জারাবলুস ও দখল নেয়া অন্য শহরগুলোতে পাঠাচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, কমপক্ষে ১০ হাজার শরণার্থী পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে তুরস্কের যারা বর্তমানে তুরস্কের কিলিস শহরে বসবাস করছে। এ বছরের মে মাসের মধ্যে উত্তর সিরিয়া তাদের নিজ এলাকায় পাঠাতে চায় তুরস্ক। গুরকান বলেন, ‘তুরস্ক এসব সিরিয়দের ফেরত পাঠাতে চায়। শুধু মানবিক কারণে নয় বরং ফেরত যাওয়া সিরিয়দের সহায়তা ও সুরক্ষা দেয়ার মাধ্যমে ওই অঞ্চলে প্রভাব সংহত করার জন্য। তবে এসব কিছু নির্ভর করবে ইদলিব নিয়ে রাশিয়ার পরবর্তী পরিকল্পনা কি তার ওপর।’
বিশ্লেষকদের ধারণা, অদূর ভবিষ্যতে রাশিয়া ও তার মিত্ররা তাদের মনোযোগ পুরোপুরি দেবে ইদলিবের প্রতি যা দেশটিতে বিদ্রোহী অধ্যুষিত সর্বশেষ প্রদেশ। গুরকান বলেন, ‘রাশিয়া যদি ইদলিব হামলা করার পরিকল্পনা করে তাহলে লড়াইয়ের পর বিদ্রোহী যোদ্ধা ও তাদের পরিবারদের স্থানান্তর করতে নতুন একটি জায়গা বেছে নেয়ার প্রয়োজন পড়বে মস্কোর। পুতিন হয়তো তাদের জারাবলুস, আল বাব ও আল রাই মধ্যবর্তী তুরস্ক নিয়ন্ত্রিত এলাকায় যেতে দিতে পারে। কাজেই, এক দিক থেকে তারা তুরস্ককে ওই ত্রিভুজ এলাকায় প্রভাব ধরে রাখার সুযোগ দিতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে শর্ত থাকবে যে তুরস্ক বিদ্রোহীদের সেখানে নিয়ন্ত্রণে রাখবে।’
অপর বিশ্লেষক ইয়েসিলাদার যুক্তি দেখিয়েছেন, ইদলিবের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর রাশিয়া সিরিয়ান শাসকগোষ্ঠীর চাপে তুরস্ককে ওই অঞ্চল থেকে পুরোপুরি সরে যেতে চাপ দেবে। ইয়েসিলাদা বলেন, ‘ইদলিবে সিরিয়া সরকার, রাশিয়া ও তাদের মিত্রদের সঙ্গে বিদ্রোহীদের ভবিষ্যৎ লড়াইয়ে বিদ্রোহীদের সমর্থন দিতে বাধ্য হবে তুরস্ক। আমি মনে করি না ওই লড়াইয়ের শেষে রাশিয়া বিদ্রোহীদের তুরস্ক নিয়ন্ত্রিত সিরিয়ান শহরে পাঠাবে। বরং তারা তুরস্ককে বলবে উত্তর সিরিয়া থেকে তাদের সেনা প্রত্যাহার করে নিতে এবং ইদলিবের বিদ্রোহী যোদ্ধাদের তুরস্কে নিয়ে যেতে।’

SHARE THIS

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 coment rios: