নাটোরে ব্রিজ আছে, রাস্তা নেই

নাটোরে দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ১৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ব্রিজগুলো কোনো কাজে আসছে না। গত এক বছর ধরে ব্রিজগুলোর সংযোগ স...

নাটোরে দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ১৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ব্রিজগুলো কোনো কাজে আসছে না। গত এক বছর ধরে ব্রিজগুলোর সংযোগ সড়ক (অ্যাপ্রোচ) তৈরি না করায় জনগণের দুর্ভোগ লাঘবের বদলে বেড়েছে দ্বিগুণ। জনসাধারণের চলাচলে অনুপযোগী হওয়ায় তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে সাধারণ মানুষের মাঝে।এদিকে অভিযোগ রয়েছে, যেখানে সেখানে অপ্রয়োজনীয় ব্রিজ নির্মাণ, নদীর গতিপথ বন্ধ এবং সংকুচিত করে নির্মাণ করা হয়েছে এই ব্রিজগুলো। আর নির্মাণের নামে তছরুপ করা হয়েছে সরকারের কোটি কোটি টাকা।
গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে নির্মিত ব্রীজ গুলোর সংযোগ সড়ক না করেই এরইমধ্যে টাকা তুলে নিয়েছেন বেশির ভাগ ঠিকাদাররা। আর ঠিকাদারদের এসব অনৈতিক কাজে সহযোগিতার অভিযোগ উঠেছে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।
২০১৬-১৭ অর্থ বছরে গতবছরের চেয়ে বরাদ্দ বাড়িয়ে ৩৩ কোটি টাকায় বিভিন্ন নদীর ওপর নির্মাণ করা হচ্ছে আরো ১০৯টি ব্রিজ ও কালভার্ট। এদিকে, গত রোববার জেলা সমন্বয় কমিটির এক সভায় সকল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে অসমাপ্ত ব্রিজের তালিকা তৈরি করে আগামী সাত কার্য দিবসের মধ্যে কাজ শেষ করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন জেলা প্রশাসক।
জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখা থেকে জানা যায়, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় ২০১৫-১৬ অর্থ বছরের গ্রামীণ রাস্তায় ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণের জন্য নাটোর জেলাকে ৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয় দুর্যোগ ব্যবস্থপনা অধিদপ্তর। বেশির ভাগ জনসাধারণের চলাচলের জন্য ব্যবহার উপযোগী করা হয়নি। বরং যে সব স্থানে ব্রীজ নির্মাণ করা হয়েছে সে সব এলাকার জনগণ পড়েছে চরম দুর্ভোগে।
সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন স্থানে ঘুরে দেখা যায়, ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে নাটোর সদর উপজেলার তেলকুপি জোলার ওপর ব্রিজ নির্মাণ করে নাটোর সদর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ। ৪০ ফুট দীর্ঘ ব্রিজটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ৩২ লাখ ৫২ হাজার টাকা। কিন্তু ২০১৫-১৬ অর্থ বছর শেষ হয়ে গেলেও আজও পূর্ণাঙ্গভাবে ব্রিজটির নির্মাণ করা হয়নি। অথচ নির্মাণের পুরো টাকা উত্তোলন করে পকেটে ভরেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে ব্রিজটির দুই পাশের সংযোগ সড়ক না থাকায় যাতায়াত করতে পারছেন না এলাকার জনসাধারণ। ফলে নতুন অবস্থায় পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে রয়েছে ব্রিজটি। 
অপরদিকে, কিছু দূরেই ছাতনী দিয়ার দক্ষিনপাড়া মসজিদের নিকট ৩২ লাখ ৫২ হাজার টাকা ব্যয়ে ৪০ ফুট দীর্ঘ অপর একটি ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। ব্রিজটি নির্মাণ করা হলেও আজও তৈরি হয়নি সংযোগ সড়ক। ফলে বাধ্য হয়ে বাশের সাঁকো তৈরি করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ব্রিজটি দিয়ে পারাপার হচ্ছে জনগণ। তবে সংযোগ সড়ক নির্মানের জন্য অর্থ বরাদ্দ থাকলেও কাজ না করেই ব্রিজ নির্মাণের পুরো টাকা তুলে নিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
স্থানীয় বাসিন্দা দুলাল সরকার, মহসিন মণ্ডলসহ আরো অনেকেই জানান, যে উদ্দেশ্য নিয়ে ব্রিজগুলো নির্মাণ করা হয়েছে, সে উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হয়নি আজও। জনগণের দুর্ভোগ লাঘবের পরিবর্তে আরো বেড়েছে। লাখ লাখ টাকা ব্যয়ে ব্রিজগুলো নির্মাণ করা হলেও জনগণের কোনো উপকারে আসছে না। দ্রুত ব্রিজগুলোর সংযোগ সড়ক নির্মাণ করে চলাচলের উপযোগী করার জোর দাবি জানান তারা।
সদর উপজেলার ছাতনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তোফাজ্জল হোসেন জানান, ২০১৫-১৬ অর্থ বছরের তার ইউনিয়নের দুটি ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। অথচ নির্মাণের এক বছর পার হলেও আজ পর্যন্ত অ্যাপ্রোচ সড়ক নির্মাণ করা হয়নি। ফলে ব্রিজ দুটি এখন নিথর পরে আছে। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে সংযোগ সড়ক করে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেও কোনো কাজ হয়নি।
এদিকে, সংযোগ সড়ক নির্মাণ না করার অভিযোগের পাশাপাশি ব্রিজ নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে।
নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করে ব্রিজ নির্মাণের কারণে গত বছরের মে মাসে সদর উপজেলার হরিশপুর ইউনিয়নের জলারকান্দি এলাকার একটি নির্মাণাধীন ব্রিজ ভেঙে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দা আবু বক্কর, উজ্জল কুমারসহ আরো অনেকে বলেন, নদী পারপারের জন্য মূলত ব্রিজ নির্মাণ করা হয় জলারকান্দি এলাকায়। কিন্তু ঠিকাদার নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে ব্রিজটি নির্মাণ করার কারণে ওই ব্রিজটি ভেঙে পড়ে। পরে পুনরায় ঠিকাদার ব্রিজটি নির্মাণ করলেও আজ পর্যন্ত সংযোগ সড়ক নির্মাণ করেনি। আর পুনরায় ব্রিজ ভেঙে পড়ার ভয়ে এখন পর্যন্ত ঢালাই কাজে ব্যবহার করা সাটারিং খোলেনি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। 
এ বিষয়ে সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আয়েশা সিদ্দিকা বলেন, ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে সদরে প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যায়ে ৯ টি এবং নলডাঙ্গা উপজেলায় প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে ৬টি ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। তবে অধিকাংশ ব্রিজের কাজ সমাপ্ত হয়েছে।
তবে অপর এক প্রশ্ন এবং তথ্য প্রমাণ তুলে ধরলে পিআইও আয়েশা সিদ্দিকা বলেন, গত অর্থ বছরের দুটি ব্রিজের কাজ এখনও চলমান, তারপরও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজ শেষ করার জন্য বারবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে তিনি মাতৃত্বকালীন ছুটির সময় সিংড়ার পিআইও অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকায় ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ করেছে বলে যুক্তি তুলে ধরেন। তাছাড়া দু একটি কাজে অনিয়ম হতে পারে সবগুলো কাজে অনিয়ম হয়নি বলেও স্বীকার করে তিনি।
পিআইও আরো বলেন, বরাদ্দকৃত মোট ব্যয়ের ১০ শতাংশ টাকা জামানত রয়েছে। কাজ পুরোপুরি ভাবে শেষ না হলে জামানাতের টাকা বাজেয়াপ্রাপ্ত হবে ঠিকাদারের।
তবে নাটোরের জেলা প্রশাসক শাহিনা খাতুনের নিকট এই প্রতিবেদক তথ্য প্রমান উপস্থাপন করলে এবং প্রতিবেদকের কাছে বিস্তারিত শুনে তিনি বলেন, সরকারি টাকা যাচ্ছেতাই অবস্থায় ব্যবহার করা হচ্ছে। আগামী দিনে সমন্বয় কমিটির মিটিংয়ে বিষয়টি উপস্থাপন করে সকল উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাদের পরিত্যক্ত ব্রিজগুলো সচল করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হবে।
তিনি আরো বলেন, সম্পূর্ণ কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত টাকা পরিশোধের কোনো নিয়ম নেই। যদি কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট ঠিকাদরদের টাকা দিয়ে থাকে তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাছাড়া কেন এতদিন ধরে ব্রিজগুলোর কাজ শেষ হয়নি সে ব্যাপারে ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হবে।
এদিকে ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের যে সব ব্রিজ নির্মাণ করা হচ্ছে তার বেশির ভাগ ব্রিজ নদীর পথ বন্ধ করে। এছাড়া নদীকে সংকুচিত করে ফেলা হচ্ছে ব্রিজ নির্মাণের মাধ্যমে। যার কারণে পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) জেলা সভাপতি রেজাউল করিম রেজা বলেন, সরকারি টাকা ইচ্ছেমতো লুটপাট করা হচ্ছে। কোনো জবাবদিহিতা না থাকায় সরকারি কর্মকর্তারা ইচ্ছামতো তছরুপ করছে। সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের উচিৎ সরেজমিনে ব্রিজগুলো দেখে কর্মকর্তা এবং ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক শাহিনা খাতুন বলেন, নদীর গতিপথ বন্ধ করে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না। নদীকে সচল রেখে সকল স্থাপনা নির্মাণ করতে হবে।
তিনি বলেন, ২০১৬-১৭ মৌসুমে নারদ নদের ওপর চার থেকে ৫টি ব্রীজ নির্মাণের জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নারদ নদের ওপর কোন স্থাপনা করা যাবে না, সে কারণে ব্রিজগুলো অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়েছে।

COMMENTS

Mountain View
নাম

অপরাধ বার্তা অভয়নগর অর্থনীতি আন্তর্জাতিক ইতিহাস/মুক্তিযুদ্ধ ইলেক্ট্রনিক্স ইসলাম ঐতিহ্য ঐতিহ্য/সংস্কৃতি কলাম কৃষি কৃষি বার্তা কেশবপুর খেলাধুলা গ্যালারী চাকরির খবর চাকুরী চুয়াডাঙ্গা চৌগাছা জাতী জাতীয় ঝিকরগাছা ঝিনাইদহ টিপস তথ্য প্রযুক্তি দর্শনীয় স্থান নড়াইল নিবন্ধ পরিবেশ প্রকৃতি/পরিবেশ প্রতিবেদন প্রবাস প্রশাসন ফেসবুক বাঘারপাড়া বিনোদন বিশেষ খবর বেনাপোল ব্যক্তিত্ব ব্যবসা/বানিজ্য ব্রেকিং নিউজ ভর্তি পরীক্ষা ভিডিও ভ্রমন মনিরামপুর মাগুরা মুক্তিযুদ্ধ যশোর যশোর সদর রাজনীতি রান্না লাইফ স্টাইল শার্শা শিক্ষাঙ্গন সংবাদ সংস্কৃতি সম্পাদকীয় সর্বশেষ সাফল্য সারাদেশ সাহিত্য সিনেমা স্বাস্থ্য Breaking Feature Greater Jessore Tips
false
ltr
item
যশোর নিউজ ২৪: Jessore News 24:: নাটোরে ব্রিজ আছে, রাস্তা নেই
নাটোরে ব্রিজ আছে, রাস্তা নেই
https://3.bp.blogspot.com/-5oayo5whRzk/WNKakj9k-AI/AAAAAAAAN4A/3POnKesgqUE9ts4VaT36DVj0Pc1OzYaugCLcB/s320/Natore-Bridge-Construction-Corruption-Picture.jpg
https://3.bp.blogspot.com/-5oayo5whRzk/WNKakj9k-AI/AAAAAAAAN4A/3POnKesgqUE9ts4VaT36DVj0Pc1OzYaugCLcB/s72-c/Natore-Bridge-Construction-Corruption-Picture.jpg
যশোর নিউজ ২৪: Jessore News 24:
http://www.jessorenews24.com/2017/03/blog-post_763.html
http://www.jessorenews24.com/
http://www.jessorenews24.com/
http://www.jessorenews24.com/2017/03/blog-post_763.html
true
286737489812364167
UTF-8
Not found any posts VIEW ALL Readmore Reply Cancel reply Delete By Home PAGES POSTS View All RECOMMENDED FOR YOU LABEL ARCHIVE SEARCH ALL POSTS Not found any post match with your request Back Home Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS CONTENT IS PREMIUM Please share to unlock Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy