২১ মার্চ, ২০১৭

একটি অ্যাপস জালিয়াতি করেই ফেরিওয়ালা ফারুক এখন কোটিপতি


বয়স মাত্র ২৮ বছর।  আর বয়সেই কোটিপতি বনে গেছেন ফারুক হোসেন মাতব্বর।  গ্রামের বড়ি ফরিদপুরের ভাঙ্গায়।  একসময় ঢাকা শহরে অলিতে গলিতে ফেরি করে কাচের গ্লাস বিক্রি করত।  কিন্তু ফেরিওয়ালা ফারুকের স্বপ্ন রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার।  সে স্বপ্ন কি আর ফেরি করে গ্লাস বিক্রিতে হয়? তাই বেছে নেয় প্রতারণার পথ।  শুরু হয় তার টেকনোলজির মাধ্যমে প্রতারণার খেলা। 
একপর্যায়ে বিভিন্ন মোবাইল কোম্পানির কাস্টমার সার্ভিসের নম্বর ক্লোন করে বিকাশ এজেন্টদের কাছে ফোন দিয়ে বিশেষ অ্যাপসের মাধ্যমে হাতিয়ে নেয় লাখ লাখ টাকা।  দেশজুড়ে তার রয়েছে শতাধিক সদস্যের শক্তিশালী সিন্ডিকেট।  এদের কেউ কেউ এজেন্টদের নম্বর সংগ্রহ করে।  কেউবা মোবাইল অপারেটরগুলোর কাস্টমার সার্ভিসের নম্বর সংগ্রহ করে।  কেউ কেউ বিকাশ এজেন্টের দোকানের সামনে ওঁত পেতে দাঁড়িয়ে থাকে।  তারা বিভিন্ন ব্যক্তির নম্বরে বিকাশের মাধ্যমে পাঠানো টাকার তথ্য ও ফোন নম্বর সংগ্রহ করে।  পরে সেসব নম্বরে বিকাশের ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে তারা প্রতারণা করে।  আর এভাবেই অ্যাপস, নম্বর ক্লোন ও বিকাশ নম্বরে ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে প্রতারণা করে টাকা আত্মসাৎ করে কোটিপতি বনে যায় ভাঙ্গার ফারুক।  শুধু তা-ই নয়, প্রতারণার টাকা দিয়ে গ্রামের বাড়িতে তৈরি করেছে অর্ধকোটি টাকার আলিশান বাড়ি।  ১০ বছর ধরে এই প্রতারণার পেশায় কাজ করে অবশেষে ধরা পড়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) জালে। 
জানা গেছে, শ্যামপুরের বিকাশ এজেন্ট ব্যবসায়ী কাজী জাকির হোসেনের কাছে চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি রাতে তার দু’টি বিকাশ নম্বরে কল আসে।  অপরপ্রান্ত থেকে এক ব্যক্তি গ্রামীণফোনের কাস্টমার সার্ভিসের লোক পরিচয় দিয়ে কথা বলে।  তিনি জাকির হোসেনের কাছে জানতে চান, বিকাশ নম্বরে নেটওয়ার্ক সমস্যাসংক্রান্ত বিষয়ে।  কথা বলার একপর্যায়ে অপরপ্রান্তের লোকটি কয়েকটি মোবাইল নম্বর দিয়ে তাতে বিকাশ ব্যবসায়ীকে কল করতে বলেন।  পরবর্তীতে ওই ব্যবসায়ী বিষয়টি সত্যি মনে করে নম্বর কয়টিতে কল দেয়ার পর হঠাৎ দেখতে পান তার বিকাশ মোবাইল একাউন্টে থাকা ৪৪ হাজার টাকা নেই।  এরপর তিনি চেক করতে গিয়ে দেখেন যে নম্বরগুলোতে তিনি কল করেছেন সে নম্বরগুলোতে টাকা চলে গেছে।  এ ঘটনায় পরপরই শ্যামপুর থানায় একটি জিডি করেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী।  এরপর ওই ঘটনার দুই মাস পর তিনি একটি প্রতারণার মামলা করেন। 
পিবিআই সূত্র জানায়, মামলাটি পিবিআইতে হস্তান্তরের পরপরই আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঘটনার সাথে জড়িত মোবাইল অপারেটরগুলোর কথিত কাস্টমার সার্ভিসের সঙ্ঘবদ্ধ চক্রটি সম্পর্কে তথ্য পায় পিবিআই।  পরে পরিদর্শক মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি টিম গত রোববার মধ্য রাতে ভাঙ্গার রায়নগর গ্রামের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ফারুক ও তার সহযোগী রাজিব খানকে (২০) গ্রেফতার করে।  ফারুকের দেশব্যাপী শতাধিক সদস্যের একটি প্রতারণার সিন্ডিকেট রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন। 
পিবিআইর ঢাকা মেট্রোর পরিদর্শক মাসুদ রায়হান জানান, পিবিআইর ঢাকা মেট্রো ও স্থানীয় পুলিশের সমন্বয়ে ২০ সদস্যের একটি টিম এ অভিযান চালায়।  গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে প্রতারণা কাজে ব্যবহৃত ১৯৩টি বিভিন্ন কোম্পানির সিম, ৫টি মোবাইল সেট ও ২টি টালি খাতা জব্দ করা হয়।  ওই খাতায় যাতে বিভিন্ন মোবাইল ফোন নম্বর লেখা ছিল।  এ ছাড়াও ওই বাড়ি থেকে একটি মোবাইল নেটওয়ার্কের টাওয়ার জব্দ করা হয়। 
পিবিআইর ঢাকা মেট্রোর এডিশনাল এসপি বশির আহমেদ বলেন, এ চক্রের দেশজুড়েই এজেন্ট রয়েছে; যারা অ্যাপসের মাধ্যমে নম্বর ক্লোন করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।  চক্রটি বেশ কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে এ প্রতারণা করে আসছে।  এর মধ্যে কেউ কেউ নম্বর সংগ্রহ করে।  কেউ ব্যবসায়ীদের টার্গেট করে। 
তিনি বলেন, আমরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি এ চক্রটির মূল হোতা ফারুক।  দেশের বিভিন্ন স্থানে তার সহযোগী থাকলেও ফরিদপুরকেন্দ্রিক বেশি।  ইতোমধ্যে আমরা বেশ কয়েকজনের বিষয়ে তথ্য পেয়েছি।  এ ছাড়াও কিছু অসাধু বিকাশ দোকানদাররা অসৎ লাভের উদ্দেশ্যে এই প্রতারক চক্রের কাছে মেসেজের মাধ্যমে গ্রাহক ও টার্গেট করা ব্যক্তিদের মোবাইল নম্বর দিয়ে থাকে।  ওই চক্রের আরো একাধিক সদস্যকে চিহ্নিত করা গেছে এবং তাদের গ্রেফতার প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে। 
প্রতারক ফারুক জানায়, সে দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর ধরে মোবাইলের বিভিন্ন সিম ব্যবহার করে মোবাইল গ্রাহকদের বিশেষ লোভনীয় পুরস্কার দেয়ার কথা বলে প্রতারণা করে আসছে।  বর্তমানে সে বিশেষ অ্যাপস ব্যবহার করে বিভিন্ন মোবাইল ফোন কোম্পানির কাস্টমার সার্ভিসের সাথে বিকাশের কাস্টমার সার্ভিসের নম্বর ক্লোন করে সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দিয়ে মোবাইলে থাকা বিকাশের টাকা হাতিয়ে নেয়।  এ রকম প্রতারণা করে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে পিবিআইর কাছে স্বীকার করেছে ফারুক। 
জানা গেছে, ফারুকের সহযোগী রাজিব বিভিন্ন দোকান থেকে ভুয়া নামে রেজিস্ট্রি করা সিম সংগ্রহ করে এবং ফারুকের প্রতারণার মাধ্যমে প্রাপ্ত টাকা ভাঙ্গার কিছু অসাধু বিকাশ দোকানদারের কাছ থেকে ক্যাশ আউট করে দেয়।  এ ছাড়া বিভিন্ন বিকাশের দোকান থেকে বিকাশ লেনদেনকারীদের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে।

SHARE THIS

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 coment rios: