২৭ জানু, ২০১৭

আমার সময় শেষ হয়ে আসছেঃ ফখরুল


গতকাল  (২৬ জানুয়ারি) ছিল বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ৭১তম জন্মদিন। ৭০ বছর পেরিয়ে এই দিন ৭১- পা রাখেন বিএনপির এই মহাসচিব। ১৯৪৭ সালের এই দিনে ঠাকুরগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। গত বছরের মার্চে দলের ষষ্ঠ কাউন্সিলে বিএনপির মহাসচিব হিসেবে নির্বাচিত হন তিনি। এর আগে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ছিলেন। ২০১১ সালের মার্চে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেন মৃত্যুবরণ করলে মির্জা ফখরুল দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হন। টানা পাঁচ বছর তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন।
বিএনপির এই সিনিয়র নেতার তার জন্মদিনের প্রথম প্রহরেই বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কাছ থেকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দনে সিক্ত হয়েছেন। আর সন্তান, স্ত্রী, বন্ধু সহকর্মীদের শুভেচ্ছাতো রয়েছেন। মির্জা ফখরুল নিজের জন্মদিনে জানিয়েছেন নিজের অনুভূতির কথা। বিএনপি মহাসচিব বলেন, ৭১-এ পড়লাম আরকি। প্রবীণের মধ্যে…। এই আছি, যে চাপের মধ্যে আছি সব ভুলে যাচ্ছি। বোঝা যায় যে অনেক বয়স হয়েছে। বয়স শারীরিকভাবে বোঝা যায় এখন।
তিনি জানান, জন্মদিনে সন্তানেরা এবং পরিবারের সদস্যরা আলাদাভাবে ঘরোয়া পরিবেশে শুভেচ্ছা জানিয়েছে। তবে তার (মির্জা ফখরুলের) মায়ের অসুস্থতার কারণে কোনও পারিবারিক আনুষ্ঠানিকতা ছিল না।
তিনি বলেন, জন্মদিনটাকে আমরাতো আর সেভাবে পালন করি না। আর আমরা রাজনীতিবিদরাও সেভাবে পালন করতে পারি না। তবে জন্মদিন নিয়ে আমার একটা ভিন্ন অনুভূতি আছে। জন্মদিন আসলেই আমার মনে হয়- আমার সময় শেষ হয়ে আসছে।
ছাত্রজীবনেই মানুষের মুক্তির স্বপ্ন দেখতেন তিনি। বামপন্থাকেই বেছে নিয়েছিলেন আদর্শ হিসেবে। নিজেকে পরিণত করেন এক তুখোড় ছাত্র নেতায়। ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি। ভূমিকা রাখেন মুক্তিযুদ্ধেও। ১৯৭২ সাল মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ সময়। বিসিএস (শিক্ষা) ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে যোগ দেন ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগে। পরে সরকারের পরিদর্শন ও আয়-ব্যয় পরীক্ষণ অধিদপ্তরে একজন অডিটর হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু নিয়তি যেন তাকে ঘুরে ফিরে রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তেই রেখেছিল। জিয়াউর রহমান সরকারের উপ-প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এসএ বারী এটি। তার ব্যক্তিগত সচিব পদে মির্জা আলমগীর দায়িত্ব পালন করেছেন ১৯৮২ সাল পর্যন্ত। স্বৈরাচার এরশাদ ক্ষমতা দখলের পর এসএ বারী উপ-প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করলে শিক্ষকতা পেশায় ফিরে যান মির্জা আলমগীর।
এবার নিজ শহর ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে অর্থনীতির অধ্যাপক পদে। কিন্তু ঠাকুরগাঁও ফিরেই যেন তিনি জড়িয়ে পড়েন রাজনীতির মূলস্রোতে। ১৬ বছরের শিক্ষকতা পেশা থেকে অব্যাহতি নিয়ে ১৯৮৬ সালে অংশ নেন ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে। জীবনের প্রথম নির্বাচনেই বিজয়ী হন তিনি। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন বিএনপিতে যোগ দিয়ে ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপি সভাপতি মনোনীত হন। ২০১৬ সালে এসে তিনি যখন বিএনপির মহাসচিব নির্বাচিত হন তখন ছেড়ে দেন ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতির পদ। যেন একটি চক্রের সমাপ্তি হয়।
তবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনীতিতে উত্থানের গল্প এতো সরল নয়। এটা অস্বীকারের জো নেই, রাজনীতিতে রয়েছে তার একটা ক্লিন ইমেজ। কথা বলেন মেপে। উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও এড়িয়ে চলেন বন্দুকের ভাষা। চারদলীয় জোট সরকারে মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা মির্জা আলমগীরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নেই। মূলত ভালো ইমেজের কারণেই তেমন প্রভাবশালী না হয়েও দলের পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে মনোনীত হন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব। যে মনোনয়ন ছিল দলের আগামী দিনের মহাসচিব হিসেবে প্রস্তুতির অংশ।
দলের তৎকালীন মহাসচিবের মৃত্যুতে অল্প সময়ের মধ্যেই ২০১১ সালের ২০শে মার্চ তিনি দায়িত্ব পান ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের। তারপর দীর্ঘ ৫ বছর ভারপ্রাপ্ত হিসেবে পালন করেছেন মহাসচিবের দায়িত্ব। এ সময়ে তাকে আসামি করা হয়েছে ৮৬টি মামলায়। ৭ দফায় কারাভোগ করেছেন এক বছরের কাছাকাছি সময়। যেতে হয়েছে রিমান্ডেও। এসব ত্যাগ স্বীকারের পুরস্কার অবশ্য পেয়েছেন তিনি। নানা বিপত্তি সত্ত্বেও চলতি বছর বিএনপি চেয়ারপারসন তাকে দলের মহাসচিব হিসেবে মনোনীত করেছেন।
১৯৪৭ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও জেলার এক বিখ্যাত রাজনৈতিক পরিবারে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জন্ম। তার পিতা অ্যাডভোকেট মির্জা রুহুল আমিন পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সরকারের আমলে একাধিকবারের এমপি ও মন্ত্রী ছিলেন। অন্যদিকে তার চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন একজন খ্যাতিমান রাজনীতিক। যিনি জিয়া সরকারের ভূমিমন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের স্পিকার ছিলেন। আইন-বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারের আমলে।
মির্জা আলমগীরের আরেক চাচা উইং কমান্ডার এসআর মির্জা মুজিবনগর সরকারের ডাইরেক্টরেট অব ইয়ুথ ক্যাম্পের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। ভোটের রাজনীতিতে প্রথমবার পৌর চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হলেও পরাজিত হন ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে। ২০০১ সালের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হন এমপি। কেবল এমপিই নন দায়িত্ব পান কৃষি প্রতিমন্ত্রী ও পরে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর। বিএনপির ঠাকুরগাঁও জেলা সভাপতির পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।
স্বচ্ছ ভাবমূর্তির মির্জা ফখরুলের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ তিনি দলকে সংগঠিত করতে পারেননি। তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত দল পুনর্গঠনে তার ভূমিকার সমালোচনা করেন অনেকে। মির্জা ফখরুল নিজে অবশ্য ব্যর্থতা মানতে রাজি নন।
কোনো রাজনীতিবিদই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন। সঙ্গতকারণেই দলের ভেতরে-বাইরে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরেরও কিছু সমালোচনা রয়েছে। রয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বী-মিত্র। তবে এ কথা বোধ হয় বলাই যায়, ‘কালিমামুক্ত রাজনীতিবিদদের মধ্যে তিনি একজন।’
ব্যক্তিগত জীবনে মির্জা ফখরুল বিবাহিত এবং দুই মেয়ের জনক।তার স্ত্রী রাহাত আরা বেগম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী। তার বড় মেয়ে মির্জা শামারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা শেষে সেখানেই শিক্ষকতা করেছেন। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় পোস্ট ডক্টরাল ফেলো হিসেবে কর্মরত আছেন। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেছেন। তিনি বর্তমানে ঢাকার একটি স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।

SHARE THIS

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 coment rios: