১৭ ডিসেম্বর, ২০১৬

খেজুর রস সংগ্রহে ব্যস্ত গাছিরা


খেজুর রস সংগ্রহে ব্যস্ত গাছিরা

ষড়ঋতুর দেশ আমাদের এই বাংলাদেশ। প্রতিটি ঋতুর আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তেমনি শীত ঋতুর একটি সুমিষ্ট বৈশিষ্ট্য হচ্ছে খেজুর গাছের রস। নীলফামারীর ডোমারে শীতের শুরুতেই খেজুর গাছের মিষ্টি রস সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন গ্রাম এলাকার গাছিরা।

শীতের তীব্রতা এখনো দেখা না দিলেও এর মধ্যে খেজুর গাছের রস সংগ্রহের কাজ শুরু করেছেন অনেকেই। দিন দিন খেজুর গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে প্রতি বছরের মতো এ বছরও চাহিদা অনুযায়ী রস পাওয়া যাবে না বলে আশঙ্কা করেছেন রস সংগ্রহকারীরা গাছিরা।

তবে 'শুস্কং কাষ্ঠং' এরকম একটি বৃক্ষ থেকে সুমিষ্ট রসও যে বের করে আনা যায়, এ গবেষণাটি আমাদের এ অঞ্চলে কে, কবে প্রথম করেছিল, তা এখন আর জানা যায় না। এখানে খেজুর গাছ থেকে মূলত রস সংগ্রহ করা হয়। একটি খেজুর গাছ ৫-৬ বছর বয়স থেকে বেশি রস পাওয়া যায়। দো-আঁশ ও পলি মাটিতে জন্মানো গাছে বেশি রস হয়। রস আহরণের জন্য সাধারণত আশ্বিন মাস থেকে গাছ কাটা করা শুরু হয়। রস পাওয়া যায় ফাল্গুন পর্যন্ত।

রসের মান ও পরিমাণ যেমন প্রকৃতীর ওপর নির্ভর করে, তেমনি গাছিরা, যারা গাছ প্রস্তুত করেন দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ওপরও তা নির্ভর করে। একবার গাছ কাটার পর ২-৩ দিন রস পাওয়া যায়। প্রথম দিনের রসকে স্থানীয়ভাবে বলে জিরেন রস। এই জিরেন রস স্বাদে ও মানে অনন্য। জিরেন রস দিয়েই তৈরি হয় উন্নতমানের গুড় ও পাটালি। দ্বিতীয় দিনে পাওয়া রসকে দো-কাট ও তৃতীয় দিনের রসকে তে-কাট বলে। এই রস দিয়ে তৈরি হয় ঝোলা গুড়।

রসের জন্য গাছ একবার কাটার পর ৫-৬ দিন বিশ্রাম দেয়া হয়। রোদে কাটা অংশ শুকিয়ে গেলে আবার ওই অংশ চেছে রস সংগ্রহ করা হয়। আর এ কারণেই সাধারণত খেজুর গাছ পূর্ব ও পশ্চিম দিকে কাটা হয়, যাতে সূর্যের আলো সরাসরি ওই কাটা অংশে পড়তে পারে।

সদর ইউনিয়নের সাচিয়া গ্রামের গাছি দেলোয়ার হোসেন ও হরিণচড়া ইউনিয়নের পরানগঞ্জ এলাকার হাদিছুর রহমান সিডু জানান, আশ্বিনের শেষের দিকে খেজুর গাছকে প্রস্তুত করতে হয় রস আহরণের জন্য। গাছের বাকল কেটে 'গাছ তোলা' হয়। গাছ তোলা শেষে গাছ কাটার পালা। কোমরে মোটা দড়ি বেঁধে ধারালো গাছিদা দিয়ে সপ্তাহে নির্দিষ্ট দিনে গাছ কেটে রস আহরণ করা হয়। খেজুরের রস পেতে হলে বেশ কিছু কাজ করতে হয়। গাছের উপরিভাগের নরম অংশকে কেটে সেখানে বসিয়ে দেয়া হয় বাঁশের তৈরি নালা। গাছের কাটা অংশ থেকে চুইয়ে-চুইয়ে রস এনে নল দিয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় জমা হয় ভাঁড়ে।

বর্তমানে বসতবাড়ি কিংবা ক্ষেত-খামারের পাশে এমনকি রাস্তাঘাটের পাশে আর আগের মতো খেজুর গাছের দেখা মিলে না। আমাদের অসচেতনতার কারণে আজ অনেকটাই বিলুপ্তির পথে পরিবেশবান্ধব গুরুত্বপূর্ণ এই খেজুর গাছ। আগের সময়ে অনেকেই খেজুর গাছের রস সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করলেও আজ খেজুর গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় বেশির ভাগ গাছিরা তাদের এই পূর্বপুরুষের পেশা ছেড়ে দিয়ে জীবিকা নির্বাহের জন্য অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। হাতে গোনা কজন এখনো ধরে রেখেছেন এই পেশা।

ডোমার উপজেলার বামুনিয়া ইউনিয়নের ইলিশা গ্রামের গাছি রমজান আলী জানান, 'আমরা জাতে বাঙালি। মৌসুমভিত্তিক কিছু খাবারের প্রতি আমরা দুর্বল। খেজুর গাছের রসের প্রতি আমাদের দুর্বলতা এখনো আছে। আমার বাবা পেশা ছিল এই খেজুর গাছের রস সংগ্রহ করা। বাবার মৃত্যুর পর আমি পেশাটি ধরে রেখেছিলাম কিন্তু দিন দিন খেজুর গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় পেশাটি বর্তমানে ছেড়ে অন্য পেশায় যোগ দিয়েছি।

SHARE THIS

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 coment rios: