২৭ নভেম্বর, ২০১৬

কাজের নয় সংকট দক্ষ ওয়েব ডেভেলপারের

রাসেল আহমেদ, দেশের অন্যতম একজন সেরা ওয়েব ডেভেলপার। ২০০৮ সাল থেকে তিনি এই পেশার সাথে সম্পৃক্ত আছেন। ২০১৩ সালে তার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি “বেসিস ডিস্ট্রিক অ্যাওয়ার্ড” লাভ করেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্র্রের একটি সুনামধন্য কোম্পানিতে লিড ডেভেলপার হিসেবে কাজ করছেন। নিজে সাফল্যের সাথে কাজ করার পাশাপাশি নতুনদের প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য ২০১১ সালে গড়ে তুলেছেন আইটি প্রতিষ্ঠান আর আর ফাউন্ডেশন। বর্তমানে তিনি প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ওয়েব ডেভেলপমেন্টের নানা দিক নিয়ে দৈনিক ইনকিলাবের সাথে কথা হয় এই ওয়েবসাইট নির্মাতার। তার সাথে কথোপকথনে ছিলেন নুরুল ইসলাম।

ইনকিলাব : ওয়েব ডেভেলপমেন্ট কী এবং এর কাজ কী?
রাসেল আহমেদ : দৈনন্দিন কাজের জন্য আমরা কম্পিউটারে অনেক ধরনেরই সফটওয়ার ব্যবহার করি। ইন্টারনেট ব্যবহারের ভিত্তিতে সফটওয়ারগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়, একটি হলো অনলাইন সফটওয়ার, আরেকটি অফলাইন সফটওয়ার। যেসব সফটওয়ার অনলাইনে কাজ করে তাদেরই মূলত ওয়েবভিত্তিক সফটওয়ার বলে। ওয়েবভিত্তিক সফটওয়ার আবার অনেক ধরনের হয়। মূলত যেসব সফটওয়ার বা অ্যাপ্লিকেশন এইচটিটিপি (যঃঃঢ়) প্রটোকলে চলে তাদের ডেভেলপমেন্ট কাজকেই বলে ওয়েব ডেভেলপমেন্ট। ওয়েব ডেভেলপমেন্টের প্রধান কাজ হচ্ছে কোডিংয়ের মাধ্যমে ওয়েবসাইটের জন্য বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশন এবং পূর্ণাঙ্গ ওয়েবসাইট তৈরি করা। অনলাইনে বিভিন্ন ধরনের এবং বিভিন্ন ডিজাইনের ওয়েবসাইট আছে। এসব ওয়েবসাইটের কাজও একেক রকম। কোন ওয়েবসাইট দিয়ে খবর পড়ি, কোন ওয়েবসাইটে বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করি আবার কোন ওয়েবসাইটে পরীক্ষার ফলাফল দেখি। এরকম আমাদের নানান দৈনন্দিন কাজের সাথে জড়িয়ে আছে হাজারো ওয়েবসাইট। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বর্তমানে প্রতি মিনিটে ৭০টি ওয়েব ঠিকানা নিবন্ধিত হয় এবং প্রতি দশ মিনিটে প্রায় ৫২০০+ ওয়েবসাইট তৈরি হয়।

ইনকিলাব : আপনি কখন এবং কীভাবে এই কাজের সাথে যুক্ত হলেন?
রাসেল আহমেদ : অনলাইন থেকেই ওয়েবসাইট ডেভেলপমেন্ট শেখার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। গ্রামে থাকার কারণে সেখানে এটা শেখার ভালো কোন প্রতিষ্ঠান বা ব্যবস্থা ছিল না। ইন্টারনেটের সমস্যা তো ছিলই। সব মিলিয়ে আমার ওয়েব ডেভেলপমেন্ট শেখার পথটা মসৃণ ছিল না। প্রথমে টেক্সট টিউটোরিয়াল পরে বিভিন্ন বিদেশি এক্সপার্টদের ভিডিও টিউটোরিয়াল, ফোরাম দেখে দেখে আস্তে আস্তে কাজ শিখতে শুরু করলাম। এভাবে শেখার পরিধি বাড়ার সাথে সাথে শেখার উৎসগুলোও খুঁজে পেলাম। সেগুলো থেকে ধীরে ধীরে নিজেকে তৈরি করে নিলাম। প্রথমে ছোট্ট ছোট্ট কাজ দিয়ে শুরু। এখনও প্রতিনিয়ত কাজ করছি আর নতুন নতুন অনেক কিছু শিখছি। কারণ ওয়েব ডেভেলপমেন্ট সম্পর্কে শেখার কোনো শেষ নেই।

ইনকিলাব : এই সেক্টরে কাজ করার জন্য কী ধরনের প্রাথমিক জ্ঞান প্রয়োজন?
রাসেল আহমেদ : ওয়েব ডেভেলপমেন্টের জন্য প্রাথমিক জ্ঞান বলতে কম্পিউটার আর ইন্টারনেট ব্যবহার জানলেই চলবে। তবে যারা এই সেক্টরে আসতে চাচ্ছেন তাদের জন্য আমি প্রথমেই বলবো আপনারা কাজের ক্ষেত্র বাছাই করে নেওয়ার আগে নিজেরাই একটু রিসার্চ করে নিন। অনলাইন থেকেই আপনার শেখাটা শুরু হতে পারে। ওয়েব ডেভেলপমেন্ট শিখতে হলে আপনাকে প্রথমে এইচটিএমএল, সিএসএস, জাভাস্ক্রিপ্ট, পিএইচপি শিখতে হবে। এরপর আস্তে আস্তে এই বিষয়গুলোতে এক্সপার্ট হতে হবে। ইউটিউবে প্রচুর টিউটোরিয়াল পাওয়া যায়। একটু এডভান্স হওয়ার পর কোড একাডেমি বা টুটপ্লাস থেকে শিখতে পারেন। আমাদের দেশেই শেখার জন্য অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যারা খুব ভালো শেখায়। ভর্তি হওয়ার আগে অন্যদের কাছ থেকে জেনে নিবেন তারা কেমন শেখায়। যে কোন প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার আগে অনলাইন থেকে বেসিকটা শিখে গেলে ভালো হবে। ইউটিউবে প্রচুর টিউটোরিয়াল পাবেন। বাংলা এবং ইংরেজিতে। প্রথমে বাংলাতে দেখুন। কিন্তু অ্যাডভান্স জানতে হলে ইংরেজির বিকল্প নেই। তাই ইংরেজিগুলোও দেখুন। আর টিউটোরিয়ালগুলো অত্যন্ত মনযোগ দিয়ে দেখতে হবে। একটা সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, সংগ্রহ করা টিউটোরিয়াল অনেকেই মনযোগ দিয়ে দেখেন না। সবসময় মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে, এটা তো আমার কাছে আছেই পরে দেখলেই তো হবে। এই পরে কিন্তু আর কখনও হয় না।

ইনকিলাব : নির্ভরযোগ্যতা ও স্থায়িত্বের বিচারে ক্যারিয়ার হিসেবে ওয়েব ডেভেলপমেন্ট কেমন?
রাসেল আহমেদ : অতীতে শুধুমাত্র বড় বড় কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানেরই ওয়েবসাইট থাকতো। কিন্তু এখন দিন বদলে গেছে। বর্তমান যুগ হলো অনলাইনের যুগ। এখন কোম্পানির ইনফরমেশন থেকে শুরু করে কোম্পানির সার্ভিস, বিভিন্ন পণ্যগুলোও অনলাইনে বিক্রয় করছে। ব্যক্তি জীবনে পাসপোর্ট বানানো, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, পরীক্ষার ফলাফল দেখা থেকে শুরু করে ব্যক্তি পর্যায়েও ওয়েবসাইট হচ্ছে। এমনকি শিশুদের জন্যও রয়েছে বিশেষায়িত ওয়েবসাইট। জীবনের প্রত্যেকটা কাজেই আমরা ওয়েবসাইটের সাহায্য নিচ্ছি। প্রতিদিনই নতুন নতুন চাহিদার ওয়েবসাইট তৈরি হচ্ছে। এই চাহিদা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। তাই নির্ভাবনায় বলা যায় যে, ক্যারিয়ার হিসেবে ওয়েব ডেভেলপমেন্টের ব্যাপক চাহিদা আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।

ইনকিলাব : এখানে খ-কালীন কাজের সুযোগ কতটুকু?
রাসেল আহমেদ : চাকরি বা পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ শেখা শুরু করা যেতে পারে। তবে খ-কালীন কাজ শেখার সময় আরেকটা বিষয় খেয়াল রাখা উচিত সেটা হলো কাজ শেখার সময় আপনার বর্তমান কাজের যেন কোন ক্ষতি না হয়। আপনাকে ব্যালেন্স করে চলতে হবে। অনেক সময় দেখা যায় চাকরি বা পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ শিখতে এসে পড়াশোনা বা চাকরিতে অসুবিধা হয়, আবার কাজ শেখাও হয়ে উঠে না। আপনাকে শেখার জন্য যে প্রতিদিন অনেক সময় দিতে হবে তা না। প্রতিদিন আপনি দুই ঘণ্টা করে সময় দিন। কিন্তু নিয়মিত সময় দিতে হবে। একদিন ৮ ঘণ্টা আর পরের ৪/৫ দিন বাদ রাখলেন তা হবে না। এভাবে ১ বছরের কাজ যদি ২ বছরেও শেখেন তাতে সমস্যা নেই। এভাবে নিয়মিত কাজ শেখার পর আস্তে আস্তে দেখবেন কাজ পেয়ে যাচ্ছেন। কাজের পারিশ্রমিক আসতে শুরু করলেই আপনি সিন্ধান্ত নিতে পারবেন যে, বর্তমান চাকরিটা রাখবেন কিনা। ফ্রিল্যান্সিং মার্কেট প্লেসগুলোতে ক্রিয়েটিভ ওয়েবসাইট ডেভেলমেন্ট করার জন্য প্রতিটি সাইটে ২০০ ডলার থেকে ২০০০ ডলার পর্যন্ত পাওয়া যায়। দেশীয় ওয়েব সাইটগুলো তৈরির জন্য ১০,০০০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৩,০০,০০০ টাকা দেয়া হয়। সুতরাং এই পেশাটাকে যেকেউ খ-কালীন হিসেবেও নিতে পারেন।

ইনকিলাব : প্রতি মাসে এখান থেকে কত টাকা আয় করা যাবে?
রাসেল আহমেদ : আসলে এই সেক্টরের আয়টা নির্ভর করবে আপনার কাজের দক্ষতার উপর। দক্ষতা বেশি থাকলে আয় বেশি হবে, দক্ষতা কম থাকলে আয় কম হবে। দেশীয় বিভিন্ন আইটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে পারবেন। অথবা নিজেই কোন ফ্রিল্যান্সিং সাইটে কাজ করতে পারবেন। তবে বর্তমানে মার্কেটপ্লেসে প্রচুর প্রতিযোগিতা হয়। প্রথমেই মার্কেটপ্লেস থেকে কাজ পেতে হয়তো সময় লাগবে। তাই এই সময়ে আপনি যে কোন কোম্পানিতে ইন্টার্ন করতে পারেন। এতে হাত খরচ হিসেবে টাকা পাবেন অপরদিকে আপনার দক্ষতার ঝুলিও ভারী হবে। বর্তমানে দেশীয় কোম্পানিতে একজন ইন্টার্ন ডেভেলপার ন্যূনতম ১০ হাজার টাকা বেতন পান। কিছুদিন চাকরি করার পর ন্যূনতম বেতন হয় ২০-৩০ হাজার টাকা। আস্তে আস্তে বিভিন্ন প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ যেমন জাভাস্ক্রিপ্ট, পিএইচপি, রুবি ইত্যাদিতে দক্ষতা আনতে পারলে দেশীয় কোম্পানিতেই ১ থেকে দেড় লাখ টাকা বেতন পাওয়া যায়। আর বাইরের মার্কেটপ্লেসে আয়টা তুলনামূলক বেশি হয়। তবে মার্কেটপ্লেসের আয় কখনো একই থাকে না। মনে রাখবেন মার্কেটপ্লেস শুধুমাত্র দক্ষদের জন্যই। একজন দক্ষ ওয়েব ডেভেলপার মার্কেটপ্লেস থেকেই ১ থেকে ৫ এমনকি কখনো কখনো ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত প্রতি মাসে আয় করতে পারবেন। দক্ষ ওয়েব ডেভলপার হলে তার জন্য কাজের কোন অভাব থাকে না। কারণ দেশে-বিদেশে ওয়েব ডেভলপিংয়ের কাজ আছে প্রচুর কিন্তু সংকট শুধু দক্ষ ডেভলপারের।

ইনকিলাব : কীভাবে কাজ করলে নবীনরা ওয়েব ডেভেলপমেন্টে সফল হতে পারবে?
রাসেল আহমেদ : নবীনদেরকে যথেষ্ট ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হবে। অধৈর্য হলে ওয়েব ডেভলপমেন্ট শেখা যাবে না। এ বিষয়ক প্রচুর বই পড়ার অভ্যাস করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে সময় নষ্ট করা যাবে না। তবে সোস্যাল সাইটে যাওয়া যাবে, সেটা হবে স্কিল ডেভেলপমেন্টের জন্য। ফেইসবুকে প্রায় শ’ খানেক স্কিল ডেভেলপমেন্টের জন্য গ্রুপ আছে। যেখানে প্রশ্ন করলে আপনি সাথে সাথেই সেই প্রশ্নের উত্তর পাবেন। আপনি সেখানে আপনার প্র্যাকটিসের কাজ শেয়ার করে অভিজ্ঞজনের মতামত নিতে পারেন। সর্বোপরি কমিউনিটির সাহায্য নিলে একদিকে আপনার যেমন আত্মবিশ্বাস বাড়বে অপরদিকে আপনার বিভিন্ন সমস্যার দ্রুত উত্তর পাবেন। কাজ শিখতে হবে স্টেপ বাই স্টেপ। কোনটা না পারলে স্কিপ করে আরেকটা ধরা যাবে না। প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময় রাখতে হবে স্কিল বিল্ডিংয়ের জন্য। কারণ এগুলো চর্চা না থাকলে ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তাই প্রতিনিয়ত একনিষ্ঠতার সাথে কাজ করে যেতে পারলেই সফলতা অর্জন করা সম্ভব হবে।

ইনকিলাব : যারা এই সেক্টরে কাজ করতে আগ্রহী তাদেরকে আপনি কী পরামর্শ দেবেন?
রাসেল আহমেদ : যারা ওয়েব ডেভেলপমেন্ট শিখতে আগ্রহী তাদেরকে বেশ কিছু সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। সেগুলো হলো- স্রোতে গা ভাসাবেন না। আপনি জানার চেষ্টা করুন আপনার কোনটা ভালো লাগে বা কোনটাতে কাজ করতে আপনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। কোনটা করলে তাড়াতাড়ি ইনকাম করা যায়, কোনটা করলে বেশি ইনকাম হবে এটা ভুলে যান। মার্কেটপ্লেসে এমনও লোক দেখা গেছে যে, এক্সেলের কাজ করে ৭০ ডলার পার আওয়ার ইনকাম করে। কিন্তু দেখা যায় যে, একজন সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ারও এমন ইনকাম করতে পারেন না। দক্ষতা থাকলে যে কোন সেক্টরেই ভালো করা সম্ভব। সেটা হোক ফ্রিল্যান্সিংয়ে বা মাটি কাটায়। পত্রিকায়, ফেইসবুকে বা বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জানতে পারলেন ওয়েব ডিজাইন কাজের প্রচুর চাহিদা। এখান থেকে প্রচুর টাকা আয় করা যায়। তাই সাত-পাঁচ না ভেবেই শেখা শুরু করে দিলেন। পরে দেখলেন এটা আপনার কাজ না। তাই ট্রেন্ড থেকে দূরে থাকুন। কারণ ওয়েব ডেভেলপমেন্ট একটি সৃষ্টিশীল কাজ। আপনি মানসিকভাবে সৃষ্টিশীল না হলে আপনার পক্ষে এটা শিখেও সফল হওয়া সম্ভব হবে না। তবে চেষ্টা করলে মানুষের অসাধ্য কিছুই নেই- এটাও সত্য। তাই নবীনদের বলবো, সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে একটু ভেবে নিবেন।

SHARE THIS

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 coment rios: