১২ অক্টোবর, ২০১৬

আজ কি শেষ হাসি মাশরাফিদের?






আরিফুর রহমান বাবু
একদিকে ইমরুল কায়েস, অন্যপ্রান্তে সাকিব আল হাসান। বাংলাদেশের রথ এগুচ্ছিল উল্কার বেগে। শেরে বাংলায় জয়ের সুবাতাস বইছিল।মাশরাফি, সাকিব, তামিম , ইমরুল , মাহমুদউল্লাহ ও মুশফিকরা জয়ের সুঘ্রাণ পাচ্ছিলেন। ভক্ত ও সমর্থকরা আগাম উৎসব করতে শুরু করেছিলেন। মোদ্দা কথা ৭ অক্টোবর রাতে শেরে বাংলায় টাইগারদের জয়ের মঞ্চ একরকম তৈরিই ছিল। ৩১০ রানের পাহাড় সমান লক্ষ্যের পিছু ধেয়ে প্রায় জয়ের দোরগোড়ায় মাশরাফির দল। কিন্তু হঠাৎ এক ঝড়ে লণ্ডভণ্ড সব। ৬ উইকেট হাতে, ৫২ বলে দরকার ৩৯ রান ঠিক এরকম অবস্থায় সাজঘরে ফিরলেন সাকিব। তারপর ভোজবাজির মত অতিদ্রুত বদলে গেল দৃশ্যপট। জয়ের ডামাডোল থামল। তার বদলে পরাজয়ের করুণ রাগিনী।
উৎসব রুপান্তরিত হলো বিষাদে। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টানা তিনবার জয়ের সুবর্ণ সুযোগ হলো হাতছাড়া। যে রাত হতে পারতো উৎসব আনন্দে মাখা, সেই রাতে আফসোস অনুশোচনায় নীল গোটা বাংলাদেশ। সময়ের চাঁকা ঘুরে আজ আবার দ্বিতীয় ওয়ানডে। আবার ইংল্যান্ডের মুখোমুখি বাংলাদেশ। রোববার শেরে বাংলায় কি করবে মাশরাফির দল? ৪৮ ঘণ্টা আগে জয় হাতছাড়া করার হতাশা দুঃখ, বেদনা ও যন্ত্রণা কাটিয়ে রোববার শেষ হাসি হাসবে টাইগাররা? মাশরাফি, তামিম, ইমরুল, সাকিব, মুশফিক, মাহমুদউল্লাহদের হাসি মুখ দেখতে উন্মুখ গোটা জাতি। হতাশার বদলে প্রিয় জাতীয় দল আবার জয়ের আনন্দে মেতে উঠুক, ‘বাংলাদেশ বাংলাদেশ ’ ধ্বনিতে কেপে উঠুক শেরে বাংলা স্টেডিয়াম ও তার আশপাশের এলাকা- গোটা জাতির উন্মুখ প্রতিক্ষা।ওপরের কথাগুলো আকাশ কুসুম কল্পনা নয়। ৭ অক্টোবর তীরে গিয়ে তরী ডুবলেও একটা সত্য পরিষ্কার ফুটে উঠেছে । তাহলো, ইংল্যান্ডের এ দলকে হারানোর পর্যাপ্ত সামর্থ্য আছে বাংলাদেশের। বাংলাদেশের এই দল ইংলিশদের হারানোর ক্ষমতা রাখেনা- এমন কথা বলতে পারবেন না অতিবড় সমালোচকও। বরং ইংলিশ মিডিয়াও প্রথম ম্যাচ শেষে মাশরাফি বাহিনীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তাদের পারফরমেন্সে মুগ্ধ। বৃটিশ মিডিয়ার ধারণা, বাংলাদেশের জয়ের মঞ্চ তৈরিই ছিল। তারা শেষ মুহূর্তের ভুলে সে মঞ্চে উঠতে পারেনি। তারা ইংলিশদের ঐ জয়কে অপ্রত্যাশিত বলে মন্তব্য করেছে। শুধু বৃটিশ মিডিয়ার কথা বলা কেন, ক্রিকেট বোদ্ধা পণ্ডিত থেকে শুরু করে সাধারণ ক্রিকেট অনুরাগি সবার ধারণা সময়ের প্রবহমানতায় বাংলাদেশ এগিয়েছে অনেক। এখন আর ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় না।
বাংলাদেশ এখন আর ব্যক্তি নির্ভর দল নয়। কারো দিকে তাকিয়েও থাকতে হয় না। মাশরাফির সাহসী, গতিশীল ও উদ্যমী নেতৃত্ব দলটির বড় চালিকাশক্তি। ইনজুরিকে জয় করা , বার বার অপারেশনের ধাক্কা সামলে মাঠে ফেরা মাশরাফির উপস্থিতিই দল চাঙ্গা করার সর্বোত্তম রসদ। সবার জানা, সাহসী, উদ্যমী ও প্রাণখোলা নড়াইল এক্সপ্রেস সহযোগিদের কাছে উদ্যম ও অনুপ্রেরণার প্রতিক। সবার সঙ্গে সমান ভাবে মেশায় যার জুড়ি মেলা ভার।এমন এক মুক্ত মনের প্রাণোচ্ছ্বল মানুষ অধিনায়ক থাকায় দলের ভিতরের পরিবেশটা হয়ে গেছে অন্যরকম। বাংলাদেশ দল যেন একটা পরিবার। তার ড্রেসিং রুমের উপস্থিতি ও মাঠে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়া, বুদ্ধি খাটিয়ে বোলিং করা এবং সঠিক সময় সঠিক সিদ্ধান্ত গত দুই বছরে রেকর্ড সাফল্যের অন্যতম উপাদান।
সেই সঙ্গে তামিম, ইমরুল, মুশফিক, সাকিব ও মাহমুদউল্লাহর মত এক ঝাঁক পরিণত ও মেধাবী ক্রিকেটারের সমন্বয়। মেধা প্রজ্ঞায় যারা নিজেদের এখন প্রায় বিশ্ব মানে নিয়ে দাঁড় করিয়েছেন। যে কোন শক্তির বিরুদ্ধে ব্যাট ও বল হাতে জ্বলে ওঠার পর্যাপ্ত ক্ষমতা আছে তাদের। গড় পড়তা ৭/৮ বছর কিংবা তারও বেশি সময় ধরে একসঙ্গে জাতীয় দলে খেলছেন। তাই বোঝাপড়া ও সমন্বয়টা দারুণ। সবাই সবাইকে চেনেন , জানেন বোঝেন। কার কি সামর্থ্য , কার কোথায় ঘাটতি ও দুর্বলতা সবার ভাল জানা। এতে করে দলের মিশ্রণটাও হয়ছে ভাল। বেশ অনেকদিন জাতীয় দলে খেলার কারণে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মেজাজ, গতি প্রকৃতি সবার ভাল জানা হয়ে গেছে। কোন পরিবেশে কি করতে হবে, কোন দলের বিরুদ্ধে কোন কৌশল হবে লাগসই- এসব এখন ভালই জানা মাশরাফি বাহিনীর। কি করে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে হয়, কোন উইকেটে কোন ধরনের দল বেশি কার্যকর? এসবও জানা হয়ে গেছে। এজন্যই সাফল্য আসছে। আসবেও।
যদিও বর্তমান ইংলিশ ক্রিকেট দল সব ফরমেটে আগের চেয়ে চৌকস। তিন ব্যাটিং স্তম্ভ অ্যালেক্স হেলস, জো রুট এউইন মরগানরা না থাকলেও ইংল্যান্ডের ব্যাটিং অ্যাপ্রোস তথা আক্রমণাত্মক মনোভাব একই আছে। জেসন রয়, বেন স্টোকস, বাটলাররা যে কোন বোলিং শক্তির বিরুদ্ধে ঝড়ো ব্যাটিং করতে পারে। সে সত্যের দেখা মিলেছে প্রথম ওয়ানডেতে। ইংলিশ ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল প্রতিকূল অবস্থাতেও আক্রমণাত্মক মানসিকতা ধরে রাখা। প্রতিপক্ষ বোলাররা যাতে তাদের চেপে ধরতে না পারে সে চেষ্টায় সচেষ্ট ইংলিশরা। সেই দল কে হারাতে সময় মত জ্বলে ওঠা খুব জরুরি। সেই সঙ্গে জানা বিষয় গুলো সঠিক সময়ে প্রয়োগ করাও দরকার। বলার অপেক্ষা রাখে না, ৭ অক্টোবর সেই কাজগুলো ঠিক মত হয়নি।
ব্যাটিং বোলিং ও ফিল্ডিংয়ের তিন শাখায় সমান ভাবে জ্বলে ওঠা সম্ভব হয়নি। শতভাগতো নয়ই, কোন ডিপার্টমেন্টে সামর্থে্যর ৭৫ ভাগও পারফরমেন্স হয়নি। ইমরুল কায়েস আর সাকিব আল হাসানের জুটি ছাড়া ব্যাটিং ডিপার্টমেন্ট ফ্লপ। তামিম, মুশফিক, মাহমুদউল্লাহ, সাব্বির ও মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত কিছুই করতে পারেননি। এদের যে কোন দুইজন ৩৫/৪০ রানের একজোড়া ইনিংস উপহার দিতে পারলেও প্রথম ম্যাচের চিত্র অন্যরকম হতে পারতো। বোলিং যেমন তেমন , ফিল্ডিংয়ের বিশেষ করে ক্যাচিং ছিল যাচ্ছেতাই। তিন থেকে চারটি লোপ্পা ক্যাচ হাতছাড়া হয়েছে। যার শতরানে ইংলিশরা ৩০০’র ঘরে পৌঁছেছে, সেই বেন স্টোক্স একাধিক জীবন পেয়ে বড় ইনিংস খেলেছেন। মোদ্দা কথা প্রথম ম্যাচে ফিল্ডারদের হাত থেকে পড়ে যাওয়া ক্যাচেই ম্যাচ হয়েছে হাতছাড়া।
তিন চারটি ভাইটাল ক্যাচ ফেলে না দিলে ইংল্যান্ডকে ২৮০’র আশপাশে বেঁধে রাখা যেত। তাহলে ম্যাচের চালচিত্রও অন্যরকম হতে পারতো। আর ব্যাটিংয়ের শেষ অংশর পুরোটাই ব্যর্থতায় ভড়া। সাকিব আউট হবার পর ৫১ বলে ৩৯ রান তোলার সহজ কাজটি হয়নি। তার বদলে মাত্র ১৭ রানে ৫ উইকেট খোয়া গেছে। এরচেয়ে খারাপ আর কি হতে পারে?
আজ সেই দুর্বলতা, ঘাটতি ও ভুলত্রুটি গুলো শুধরে নিতে পারলে অবশ্যই ফল অনুকূলে আসবে। আহামরি কিংবা বিধ্বংসী খেলার দরকার নেই। প্রথম ম্যাচের মত স্পোর্টিং উইকেটে খেলা হলে বোলিংটা হওয়া চাই টাইট। কোনরকম বাড়তি পরীক্ষা নিরীক্ষা না চালিয়ে জায়গামত বল ফেলার চেষ্টা থাকে হবে শেষ পর্যন্ত। তার সাথে ফিল্ডিং ব্যাকআপ হওয়া চাই নিঁখুত। ভাইটাল ক্যাচ ফেলা যাবেনা কিছুতেই। ব্যাটিং প্রথম ছয় জনের অন্তত দুজনার লম্বা ইনিংস প্রয়োজন। আর বাকিদের মধ্যে অন্তত একজোড়া মাঝারি (৩৫-৪০) স্কোর দরকার।
সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন শেষটা ভাল করা। সেটাই দরকার। আগের ম্যাচের মত শেষ দিকে ক্যাচ মিসের মহড়া আর ১৭ রানে ইনিংসের শেষ অর্ধেকের পতন ঘটালে চলবে না। ক্রিকেটে ভাল শুরুর গুরুত্ব আছে। শুভ ও সাবলীল সূচনা ম্যাচ জেতার পূর্বশর্ত। তবে তার চেয়ে বড় সত্য হলো, সুন্দর ও নিপুণ ফিনিশিং। শেষ ভাল হলেই জয়ের মালা গলায় পরা যায়।
আজ কি সেই ভুলত্রুটি কাটিয়ে উজ্জীবিত রুপের দেখা মিলবে?
 সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক



SHARE THIS

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 coment rios: