১৯ আগস্ট, ২০১৬

৪৫ কিলোমিটার দৌড়ে অফিস করেন আবদুর রাজ্জাক!

রেলগাড়ি আর বৃদ্ধাকে নিয়ে রাজশাহী অঞ্চলে একটি প্রচলিত কৌতুক আছে। কৌতুকটি হচ্ছে বৃদ্ধা মহিলা বলছেন, আমার তাড়া আছে। আমি হাঁটলাম। তোমরা ট্রেনে এসো। তবে আবদুর রাজ্জাকের জন্য বিষয়টি মোটেই কৌতুক নয়। বাস্তব। বাসে গেলে সময় লাগে প্রায় দুই ঘণ্টা। আবদুর রাজ্জাক হেঁটে গেলে সময় নেন প্রায় আড়াই ঘণ্টা। আবদুর রাজ্জাক হাঁটেন ‘জোর কদমে’। অর্থাৎ তার হাঁটাকে হাঁটা না বলে ‘দৌড়-ই’ বলতে হয়। তাই বলে একটানা ৪৫ কিলোমিটার! হ্যাঁ, টানা ৪৫ কিলোমিটার পথ দৌড়ে অফিসে যান তিনি। আবার দৌড়েই বাড়ি ফেরেন। অবশ্য ফেরার সময় আরও আধা ঘণ্টা সময় বেশি নেন।
এই দৌড়বিদের বাড়ি নওগাঁ সদর উপজেলার বখতিয়ারপুর গ্রামে।
তিনি এখন কীর্তিপুর তহশিল অফিসের অফিস সহকারী পদে কর্মরত আছেন। তার বয়স ৪০।
বখতিয়ারপুর গ্রামের জহির উদ্দিন সরদারের ছয় ছেলেমেয়ের মধ্যে আবদুর রাজ্জাক সবার ছোট। পড়াশোনা করেছেন অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। গত ২১ জুলাই সকালে রাজ্জাকের বাড়িতে কথা হয় তার সঙ্গে। কীভাবে এই কঠিন কাজ সম্ভব করছেন, জানতে চাইলে রাজ্জাক বলেন, নাটোরে বড় ভাইয়ের বাসায় থাকতাম। টুকটাক টিউশনি করি। ১৯৯৩ সালের কথা। নাটোরের সিংড়া ব্রিজ থেকে রেলস্টেশন পর্যন্ত ম্যারাথন দৌড় প্রতিযোগিতা হবে শুনেই অংশ নিলাম। প্রথম হলাম। একইভাবে পরপর ছয়বার প্রথম হলাম।
আবদুর রাজ্জাক জানান, প্রথমবার তার প্রতিভা দেখেই আনসার বাহিনীর পক্ষে ঢাকায় আনসার একাডেমিতে ৪২ কিলোমিটার ম্যারাথন দৌড় প্রতিযোগিতায় তার ডাক পড়ে। সেখানে তৃতীয় হন তিনি। এ ছাড়া রাজশাহীতে ‘অলিম্পিক ডে রান’ প্রতিযোগিতায় পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন হন। একই সময়ে ঢাকায় জাতীয় অ্যাথলেটিকস প্রতিযোগিতায় ৪২ কিলোমিটার দৌড়ে চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম স্থান অধিকার করেন।
আবদুর রাজ্জাকের ভাষায়, এই দৌড়ের সূত্র ধরেই আমার চাকরিতে যোগদান। ২০০৮ সালের কথা। নওগাঁয় বাড়িতেই থাকি আর নিয়মিত প্র্যাকটিস করি। প্র্যাকটিস দেখে সেনাবাহিনীর দুই কর্মকর্তা ডেকে আমার সম্পর্কে জানতে চান। তারা আমার সনদগুলো দেখে ভীষণ খুশি হন। তখন নওগাঁয় জেলা প্রশাসক ছিলেন শেফাউল করিম। তারা আমাকে বলেন, আবদুর রাজ্জাক আমাদের সম্পদ। তাকে কাজে লাগাতে হবে। তারা আমার জন্য একটা চাকরির সুপারিশ করেন। এরপর চাকরির সার্কুলার হলে তহসিল অফিসে অফিস সহকারী পদে আবেদন করি। চাকরি হয়ে যায়। নওগাঁর ধামুইরহাট উপজেলার আড়ানগর ইসবপুর তহসিল অফিসে যোগদান করি।সর্বশেষ ২০০৭ সালে কক্সবাজারে ‘বাংলা ম্যারাথন’ দৌড়ে অংশ নেন তিনি।
আবদুর রাজ্জাক জানান, চাকরিতে ঢোকার পরে তার প্র্যাকটিসের আর সময় হাতে থাকে না। বাড়ি থেকে অফিসের দূরত্ব ৪৫ কিলোমিটার। বাস বিভিন্ন স্টপেজে থামতে থামতে যায়। সময় লাগে প্রায় দুই ঘণ্টা। তিনি সিদ্ধান্ত নেন—দৌড়েই অফিসে যাবেন। এতে একই সঙ্গে তার অনুশীলন হয়ে যাবে। যা বলা, তাই কাজ। তিনি আড়াই ঘণ্টায় অফিসে যান। তিন ঘণ্টায় ফিরে আসেন। দুই বছর পরে তাকে একই উপজেলার ভরতিডাঙ্গা তহসিল অফিসে বদলি করা হয়। বাড়ি থেকে দূরত্ব ছিল ৪৭ কিলোমিটার। সেখানে তিন মাস একইভাবে দৌড়ে গিয়ে চাকরি করেছেন। এরপর তাকে নওগাঁর সদর উপজেলার কীর্তিপুর অফিসে বদলি করা হয়। বাড়ি থেকে দূরত্ব মাত্র পাঁচ কিলোমিটার। দূরত্ব কমলেও আবদুর রাজ্জাকের দৌড় থামেনি। তিনি উল্টো পথে ৪০ কিলোমিটার ঘুরে একইভাবে অফিস করেন।
গত বছর তিনি একটি দুর্ঘটনার শিকার হন। একটি ট্রাকের পাশ দিয়ে দৌড়ে যাওয়ার সময় পাথরকুচি এসে পড়ে তার চোখে। চিকিৎসা করছেন। কিন্তু তেমন উন্নতি হয়নি। এখনো চোখে ঝাপসা দেখেন। এ জন্য অনুশীলন করতে পারছেন না। আবদুর রাজ্জাক বলেন, চোখ ঠিক হলেই আমি আবার ৪০ কিলোমিটার দৌড়েই অফিস যাওয়া-আসা শুরু করব।
শুনে অবাক হতে হলো, এ রকম দৌড়বিদের খাদ্যতালিকায় খুব একটা বিশেষ কিছু নেই। সকালে ৫০ গ্রাম কাঁচা ছোলা খেয়ে বের হন। অফিসে পৌঁছানোর পর ১০০ গ্রাম কাঁচা বাদাম খান। এ ছাড়া দৈনিক দুটি ডিম আর কলা। আর বাকি সবই দৈনন্দিন স্বাভাবিক খাবার।
আবদুর রাজ্জাকের দুই মেয়ে ও এক ছেলে। বড় মেয়ের বয়স ১০ বছর। ছেলেটা ছোট, বয়স দেড় বছর।
আবদুর রাজ্জাকের দৌড় সম্পর্কে বলতে গিয়ে রাজশাহী বিভাগীয় তহসিলদার সমিতির মহাসচিব মোদুদুর রহমান বলেন, ‘এলাকায় আবদুর রাজ্জাক “ম্যারাথন রাজ্জাক” হিসেবেই পরিচিত। তিনি ভীষণ পরোপকারী ও ভালো মনের মানুষ। কেউ কোনো জিনিস আনতে বললে রাত-দিন দেখা নেই তিনি দৌড়ে গিয়ে তা এনে দেন।

SHARE THIS

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 coment rios: