৪ অক্টোবর, ২০১৫

যশোরে বিদেশীদের নিরাপত্তায় মাঠ প্রশাসন সতর্ক

বিদেশীদের নিরাপত্তা নিয়ে মাঠ প্রশাসন খুবই সতর্কতা অবলম্বন করছে। ঢাকা থেকে একের পর এক নির্দেশনা আসছে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। বিদেশী নাগরিকরা কে, কখন, কোথায় যাচ্ছেন তা নজরে রাখতে বলা হচ্ছে। এমনকি চাওয়া মাত্র পুলিশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও বলা হয়েছে। রবিবার চার জাপানী নাগরিক যশোরের একটি গ্রামে গেছেন পুলিশ প্রহরা নিয়ে।

এদিকে রবিবার একটি বেসরকারি এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটযোগে ১৭ জন বিদেশী নাগরিক যশোর থেকে ঢাকা ফিরেছেন। এ নিয়ে হঠাৎ চাঞ্চল্য সৃষ্টি হলেও পরে জানা যায়, তাদের ঢাকায় ফেরা ছিল পূর্বনির্ধারিত। এর সঙ্গে সম্প্রতি রংপুরে জাপানী নাগরিক নিহত হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে বিদেশী, বিশেষ করে জাপানী নাগরিক, যারা মাঠপর্যায়ে কাজ করেন, এরই মধ্যে সতর্কতা অবলম্বন শুরু করেছেন।

গত সোমবার ঢাকায় একজন ইতালিয়ান নাগরিক খুন হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে কর্মরত বিদেশী নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাঠ প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু এর মাত্র চার দিন পর শনিবার রংপুরে এক জাপানী নাগরিক নিহত হন। এর পর পরই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং দপ্তরগুলোর হেড কোয়ার্টার থেকে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছে একের পর এক নির্দেশনা আসতে থাকে। রবিবার সকালেও পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগগুলোর জেলা পর্যায়ের কার্যালয়ে নতুন করে নির্দেশনা এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

পৃথক পৃথক নির্দেশনায় সংশ্লিষ্ট জেলায় অবস্থানরত বিদেশী নাগরিকদের নিরাপত্তায় কোনো ত্রুটি আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের। এ ছাড়া বিদেশী নাগরিকরা কে কখন কোথায় যাতায়াত করছেন, তাও মনিটরিং করতে বলা হয়েছে। সম্ভব হলে বিদেশীরা যাতে একাকী চলাচল না করে জোটবদ্ধ থাকেন, সেদিকে দৃষ্টি দিতেও বলা হয়েছে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের। এ ছাড়া বিদেশীরা চাইলেই যাতে পুলিশী নিরাপত্তা পেতে পারেন, নির্দেশনায় তাও নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।

জানতে চাইলে যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কে এম আরিফুল হক বলেন, ‘পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে আসা নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা হিসেবে করে দেখেছি, এই মুহূর্তে যশোরে ২৪ জন বিদেশী নাগরিক অবস্থান করছেন। তারা মূলত আছেন তিন-চার স্থানে। জাপানী, মার্কিনসহ অন্য দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা যাতে বিঘ্নিত না হয়, তার সব ব্যবস্থা করা হয়েছে।’

একটি গোয়েন্দা সংস্থার একজন কর্মকর্তা তার দপ্তরে হেডকোয়ার্টার থেকে নির্দেশনা আসার কথা স্বীকার করেন।

তিনি বলেন, ‘একই ধরনের নির্দেশনা সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরে এসেছে। আজ থেকেই বিদেশীদের চাহিদা অনুযায়ী পুলিশ প্রটেকশন দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া বিদেশী নাগরিকরা অনিরাপদ বোধ করছেন কি না তাও নজরে রাখা হচ্ছে।’

যশোর শহর থেকে সকালে চৌগাছা উপজেলার জগদীশপুরে যান জাইকার (জাপানী আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা) চার কর্মী। এই জাপানী নাগরিকরা যশোরে আর্সেনিক নিয়ে কাজ করছেন। এতদিন তারা মুক্তভাবে চলাচল করলেও আজ ছিল ভিন্ন ব্যবস্থা। জাপানী এই চার নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ প্রটেকশন দেওয়া হয়।

চৌগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সহিদুল ইসলাম বলেন, ‘জাপানী নাগরিকদের দুপুর ১টা পর্যন্ত জগদীশপুর থাকার কথা। তারা যত সময় চৌগাছা এলাকায় থাকবেন আমার পুলিশ তত সময় তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।’

জাপানের টোকিওর একটি কনসালটিং ফার্ম কোকুসাইবিজ ইনকর্পোরেটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়োইসি সিবাটা দুপুরে সাতক্ষীরা থেকে গাড়িযোগে ঢাকায় ফিরছিলেন। একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের হয়ে সাতক্ষীরায় আর্সেনিক প্রোগ্রামের কনসালটেন্ট হিসেবে এসেছিলেন তিনি। পথে যশোরে লাঞ্চ করার সময় কথা হয় তার সঙ্গে।

ইয়োইসি সিবাটা বলেন, ‘রংপুরে জাপানী নাগরিক খুনের ঘটনায় ঢাকায় জাপান দূতাবাস খুবই উদ্বিগ্ন। আমাদের সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে। তবে আমি মোটেই আতঙ্কিত নই।’

১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত সিবাটার এই কনসালটিং ফার্মের ক্যাপিটাল এখন দশ মিলিয়ন ইয়েন। তার প্রতিষ্ঠানের দেওয়া সার্ভিসগুলোর মধ্যে রয়েছে ম্যানেজমেন্ট কনসালটিং, মার্কেট এন্ট্রি সাপোর্ট, ফিজিবিলিটি স্টাডি, ইমপ্লিমেনটেশন প্লান, কমপিটেটিভ এ্যানালাইসিস, জাপান, চীন, কোরিয়া, ভারত, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের মার্কেট রিসার্চ।

সিবাটা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমার পরিবার রয়েছে জাপানে। তারা বাংলাদেশে জাপানী নাগরিক খুন হয়েছেন শুনে বিচলিত ও উদ্বিগ্ন। কিন্তু আমি মনে করি, এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।’

আতঙ্ক বা জাপানী দূতাবাসের সতর্কতা জারির কারণে তড়িঘড়ি ঢাকা ফিরছেন কি না জানতে চাইলে সিবাটার সঙ্গে থাকা বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত জাপানী নাগরিক রফিকুল আলম বলেন, ‘আতঙ্ক-টাতঙ্ক কিছু না। কাজ শেষ। তাই এখন ঢাকায় ফিরছি।’

এদিকে রবিবার ইউএস বাংলার সকালের ফ্লাইটে ১৭ জাপানী নাগরিক যশোর থেকে ঢাকা যান। এ কারণে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, আতঙ্কের কারণে জাপানী নাগরিকরা মফস্বল ছেড়ে যাচ্ছেন।

পরে এ ব্যাপারে জানতে কথা হয় ইউএস বাংলার যশোর অফিসের ইনচার্জ সাব্বির হোসেনের সঙ্গে। তিনি ইউএস বাংলার সকাল সাড়ে ৮টার ফ্লাইটে ১৭ জাপানী নাগরিকের ঢাকা ফেরার তথ্য নিশ্চিত করেন। তবে এও জানান, তাদের ঢাকা ফেরা ছিল পূর্বনির্ধারিত। সম্প্রতি বিদেশী নাগরিক খুনের পর যে পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, তার সঙ্গে এই জাপানীদের ঢাকায় ফেরার কোনো সম্পর্ক নেই।

সাব্বির বলেন, ‘‘জাপানী ওই নাগরিকরা ট্যুরিস্ট হিসেবে বাংলাদেশে আসেন। ‘টুর প্ল্যানার’নামে একটি ট্যুর অপারেটর তাদের ফিরতি টিকিট কেটে রেখেছিল ৭ সেপ্টেম্বর, অর্থাৎ প্রায় এক মাস আগে।’’

যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কে এম আরিফুল হক বলেন, ‘বিদেশীদের যাতায়াত আগের মতই আছে। কয়েকদিনের মধ্যে বেশ কয়েকজন আমেরিকান নাগরিক এই অঞ্চলে এসেছেন। আবার কয়েকজন জাপানী নাগরিক এখান থেকে ঢাকা গেছেন। এটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিদেশী নাগরিকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করছি। আর যে সব প্রতিষ্ঠানের হয়ে বিদেশীরা কাজ করতে আসেন, আমরা তাদের উৎসাহিত করছি যেন বিদেশীদের আসা-যাওয়া, অবস্থানের বিষয়টি পুলিশকে জানায়।’

এর আগে গেল সপ্তাহে ঢাকায় একজন ইতালিয়ান নাগরিক খুন হওয়ার পর খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে সেখানে অবস্থানরত ৫৯ বিদেশী নাগরিকের যাতায়াত ও অবস্থান জানাতে অনুরোধ করা হয় সংশ্লিষ্টদের।

SHARE THIS

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 coment rios: