৩০ জুলাই, ২০১৫

শনিবার বিলীন হচ্ছে ছিটমহল

নিবার (৩১ জুলাই) ঘড়ির কাঁটায় রাত ০১ মিনিটেই সৃষ্টি হচ্ছে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবেশী দুই রাষ্ট্রের ছিটমহল নামক ১৬২ ভূখণ্ড বিনিময়ের ইতিহাস। ছিটমহল বিলুপ্তির পাশাপাশি অবসান ঘটছে ৫৫ হাজার ৬৬৪ জন মানুষের ৬৮ বছরের অবরুদ্ধ জীবনের।
 
ঐতিহাসিক এই মুহুর্ত স্মরণীয় করে রাখতে কুড়িগ্রামের ১২টি ছিটমহলের বাসিন্দারা নিয়েছে ব্যাপক কর্মসূচি। মশাল ও বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা হাতে আনন্দ মিছিল, মিষ্টি বিতরণ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোয় প্রার্থনা, গ্রামীণ খেলাধুলা, নৌকাবাইচ, ঘোড় দৌড়, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বাড়িতে বাড়িতে বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা, সন্ধ্যায় ছিটমহলগুলোর প্রতি বাড়িতে ৬৮টি করে মোমবাতি প্রজ্বলন, আলোকসজ্জা ও রাত ০১ মিনিটে ৬৮ বার তোপধ্বনি করা।
 
ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ.জে.এম এরশাদ হাবিব ও ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন মাহমুদ বলেন, নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে এদিন ছিটমহলগুলোতে সরকারি কোন কর্মসূচি নেয়া হয়নি। তবে তাদের এই মহোত্সবে আমরা অংশগ্রহণ করে কালের সাক্ষী হতে চাই।
 
আনন্দে উদ্বেলিত দাসিয়ারছড়ার নজরুল ইসলাম, মোজাফ্ফর হোসেন, মিজানুর রহমান, আজিজার রহমান, আলাউদ্দিন, সুরত আলী, আব্দুল হামিদ বলেন আমরা এতদিন নিষ্পেষিত, নিপীড়িত ছিলাম ও অবরুদ্ধ জীবন কাটিয়েছি। আজকের এই দিনটির জন্য আমরা অপেক্ষা করেছি ৬৮ বছর। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের মানুষ যেমন মুক্তির আনন্দে ভেসেছিল আমাদের মনেও আজ তেমন আনন্দ হচ্ছে।
 
কালমাটির আশতিপর বৃদ্ধ একাব্বর হোসেন ও খলিলুর রহমান বলেন, স্বাধীনতা দেইখা মরবার চাই। আল্লাহ যেন আমাগোরে আর একটা দিন বাঁচাইয়া রাখে।
 
ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির বাংলাদেশ অংশের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা বলেন, আজ আমরা একটি ঐতিহাসিক মুহুর্তের বড় সাক্ষী হচ্ছি একথা ভেবেই মন আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠছে। কারণ পরাধীনতার শৃঙ্খল মুক্তির এই আনন্দের চেয়ে আমাদের কাছে অধিক আনন্দের আর কিছু হতে পারে না।
 
একই অবস্থা চলছে সদ্য বাংলাদেশ ভূখণ্ডে মিশে যাওয়া ভারতীয় ১১১ ছিটমহল ও ওপারের ভূখণ্ডে মিশে যাওয়া বাংলাদেশের ৫১ ছিটমহলের অধিবাসীদের মধ্যে। মুক্তির বাঁধভাঙ্গা উচ্ছ্বাস এখন তাদের চোখে মুখে।
 
ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির কেন্দ্রীয়সহ সম্পাদক দীপ্তিমান সেন গুপ্ত বলেন, প্রতিবেশী দুটি রাষ্ট্রের সরকার প্রধানকে ধন্যবাদ। কারণ তারা তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতি রেখেছেন। আর এই আনন্দঘন মুহূর্তে মায়ের কাছে সন্তান জন্ম দেয়া যেমন কষ্ট ও আনন্দের আমাদের কাছে ঠিক তেমনটাই মনে হচ্ছে। আজ এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী দুই দেশের ১৩৮ কোটি মানুষ।
 
উল্লেখ্য, ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভেঙে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি রাষ্ট্র জন্মের সময় সীমারেখা নির্ধারণে লর্ড মাউন্টব্যাটেনের পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্রিটিশ আইনজীবী সিরিল রেডক্লিফকে প্রধান করে সীমানা নির্ধারণ কমিশন গঠন করা হয়। ঐ বছরের ৮ জুলাই লন্ডন থেকে ভারতে আসেন রেডক্লিফ। এর কয়েকদিন পর ১৩ আগস্ট তিনি এই সংক্রান্ত চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেন। ১৬ আগস্ট জনসমক্ষে তা প্রকাশ করা হয়। অভিযোগ আছে, গভীর ভাবনা চিন্তা ছাড়াই জমিদার, নবাব, স্থানীয় রাজনীতিবিদ ও চা-বাগানের মালিক দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সময় না নিয়েই সীমানা মানচিত্র তৈরি করা হয়।
 
১৪ আগস্ট পাকিস্তান ও ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীনতা পেলেও অনেক পরে স্বতন্ত্র রাজ্য কুচবিহারের মহারাজা নারায়ণ ভুপ বাহাদুর পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী বিধান চন্দ্র রায়ের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় ভারতীয় ইউনিয়নে যুক্ত হন। ভারত ও পাকিস্তান অংশে বিভিন্ন মৌজায় রাজার খাস খতিয়ানভুক্ত জমি ভারতের অধীনে চলে গেলে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশের অভ্যন্তরে লালমনিরহাটে ৫৯টি, পঞ্চগড়ে ৩৬টি, কুড়িগ্রামে ১২টি, নীলফামারীতে চারটি মোট ১১১ টি ছিটমহল ভারতের অংশ হয়ে যায়। যার আয়তন ১৭১৫৮.১৩ একর।
 
সর্বশেষ ৬-১৬ জুলাই যৌথ সমীক্ষানুযায়ী এখানের ৪১ হাজার ৪৪৯ জন নাগরিকের মধ্যে ঠিকানা পরিবর্তন করে ভারতের মূল ভূখন্ডে যাওয়ার আবেদন করেছেন ৯৭৯ জন। তাদেরকে বিশেষ নিরাপত্তায় ১ আগস্ট থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত বুড়িমারী, হলদিবাড়ি ও সাহেবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাঠিয়ে দেয়া হবে।
 
অন্যদিকে, ময়মনসিংহের কাশিমবাজার স্টেটের মহারাজা শ্রীশ চন্দ্র নন্দী, কুড়িগ্রামের পাঙ্গারাজা শচীন চন্দ্র কোঙ্গার, দিনাজপুরের মহারাজা গিরীজা প্রসাদ, রংপুরের রাজা জগৎ ভূপেন্দ্র নারায়ণ ও নীলফামারীর মহারানী বৃন্দা রানী পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় ভারতীয় ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে বিভিন্ন মৌজায় অবস্থিত নিজস্ব খাস খতিয়ানভুক্ত জমিগুলো তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হয়ে যায়। এর সংখ্যা ৫১টি। এগুলো ভারতের কুচবিহার জেলার দিনহাটা ও তুফানগঞ্জ মহকুমার অভ্যন্তরে অবস্থিত, যার আয়তন ৭১১০.২ একর। জমিগুলো পৃথক মৌজায়। সেই মৌজার ভিতরে এক বা একাধিক এলাকার ছোট ছোট ছিট রয়েছে। সর্বশেষ যৌথ সমীক্ষানুযায়ী, এর জনসংখ্যা ১৪ হাজার ২১৫ জন। এদের কেউই ঠিকানা পরিবর্তনে রাজি হয়নি।

SHARE THIS

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 coment rios: