২৮ মে, ২০১৫

পরিবারের অভিযোগ পুলিশের বিরুদ্ধে

যশোরে ইসমাইল হোসেন ও আল আমিন নামের দুই বন্ধু গণপিটুনির শিকার নয় বরং পুলিশ তাদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জোড়া খুনের ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার জন্য পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ডাকাতির এ নাটক সাজিয়েছেন। পুলিশের বক্তব্য ও কথিত ছিনতাইয়ের কবলে পড়া বরুণ তরফদারের ভাষ্যে হত্যাকাণ্ডের রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে। রহস্য উন্মোচনে কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শিকদার আক্কাছ আলী ও বরুণ তরফদারকে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানিয়েছে নিহতের পরিবার। আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জোড়া খুনের রহস্য উন্মোচন করা না হলে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের নাম উল্লেখ করে আদালতে মামলা করা হবে বলে জানান নিহত ইসমাইল হোসেনের মামা কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের পাঠাগারবিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন দিপু। বুধবার সকালে যশোর প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে ইসমাইল ও আল আমিনের হত্যাকাণ্ড পুলিশের পরিকল্পিত উল্লেখ করে পরিবারের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা তুলে ধরা হয়।
ডাকাতির ঘটনায় পুলিশ ও বরুণের ভাষ্য নিয়ে ধূম্রজাল : গত ২৪ মে রাতে যশোর-মাগুরা মহাসড়কের হুদারাজাপুর মোড় এলাকায় সদর উপজেলার আড়পাড়া গ্রামের আবদুল আজিজের ছেলে আল আমিন (২৪) ও যশোর সদর উপজেলার তরফ নওয়াপাড়া গ্রামের বিল্লাল হোসেনের ছেলে যশোর পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের ছাত্র ইসমাইল হোসেনকে (২১) কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পুলিশের দাবি, নিহত দুই ব্যক্তি মোটরসাইকেল ছিনতাই করতে গিয়ে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন। তাদের কাছ থেকে তিনটি চাকু ও একটি বিদেশী পিস্তল উদ্ধার করা হয়েছে। যার মূল্য এক লাখ ষাট হাজার টাকা। তবে পুলিশের খাতায় তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। আওয়ামী লীগ নেতা মঞ্জুর রশিদ হত্যার ঘটনায় সন্দেহভাজন ছিলেন। অপরদিকে ডাকাতির কবলে পড়া সেই বরুণ তরফদারের বক্তব্যে ধূম্রজালের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার পর তিনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, রোববার রাত ১০টার দিকে শহর থেকে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন তিনি। পাঁচবাড়িয়া এলাকা পার হওয়ার পর তিনি বুঝতে পারেন দুটি মোটরসাইকেলে করে দুর্বৃত্তরা তার পিছু নিয়েছে। কিছুদূর যাওয়ার পর একটি মোটরসাইকেল সামনে চলে যায়। পেছনের মোটরসাইকেলে থাকা হেলমেট পরা দু’জন দুর্বৃত্ত তাকে দাঁড়াতে বলে। এ সময় বরুণ গতি আরও বাড়িয়ে দেন। দুর্বৃত্তদের মোটরসাইকেলে থাকা একজন চলন্ত অবস্থায় চাকু বের করে দু’বার বরুণকে আঘাত করার চেষ্টা করে। এ সময় তিনি হাতে ঘুষি মারলে দুর্বৃত্তদের হাত থেকে চাকু পড়ে যায়। পরে তারা পিস্তল বের করে। তখন ‘ডাকাত ডাকাত’ বলে চিৎকার করতে থাকেন। হুদারাজাপুর এলাকায় পৌঁছালে তাদের মোটরসাইকেলের সঙ্গে বরুণের মোটরসাইকেলের ধাক্কা লাগলে উভয় আরোহী পড়ে যান। তখন আবার ‘ডাকাত ডাকাত’ বলে চিৎকার দিলে স্থানীয় জনতা জড়ো হয়ে ওই দু’জনকে গণপিটুনি দেন। পুলিশ ও বরুণের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে নিহতের স্বজনরা জানিয়েছেন, পাকা রাস্তার ওপর পড়ে গেলে গায়ে আঘাতের চিহ্ন থাকবে। কিন্তু নিহত দু’জনের মাথা ছাড়া শরীরের অন্য কোথাও আঘাত নেই।
পুলিশের বিরুদ্ধে জোড়া খুনের অভিযোগ : কথিত ছিনতাইয়ের শিকার বরুণ তরফদার এবং তার তৈরি ডাকাতির ঘটনাটি একটি রূপকথার গল্পের মতোই। কারণ ছিনতাই এবং গণপিটুনির ঘটনার সত্যতা স্থানীয় জনতা জানেন না। গণপিটুনির কথা বলা হলেও নিহতদের মাথা ও মুখমণ্ডল ছাড়া শরীরের কোথাও কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই। নিহতদের মাথা ও ঘাড়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাতের অসংখ্য চিহ্ন এবং মাথার খুলির সামনের অংশ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। ধারণা করা হচ্ছে, মাথার সামনের অংশে ভারি কোনো অস্ত্র দ্বারা আঘাত করা হয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডটি নারায়ণগঞ্জের সেভেন মার্ডারের মতো বলে মনে করছেন নিহত ইসমাইলের মামা দেলোয়ার হোসেন দিপু।
জোড়া খুনের নেপথ্য দুটি কারণ : জোড়া খুনের নেপথ্যে দুটি উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে পরিবারের দাবি। প্রথমত. পুলিশ মঞ্জুর রশিদ হত্যা মামলার সঙ্গে নিহত ইসমাইলকে সন্দেহভাজন হিসেবে খুঁজছিল। তার বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে তথ্য আছে বলে স্বীকার করা হয়। তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা করছেন বলে আমাকে জানিয়েছিলেন কোতোয়ালি থানার ওসি। কিন্তু ইসমাইল তার কলেজ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং বাড়িতে নিয়মিত থাকতেন। কিন্তু পুলিশ কীভাবে পেল না। এখানে সন্দেহ হয়। দ্বিতীয় কারণ হতে পারে, যশোর পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে পড়ুয়া একটি হিন্দু মেয়ের সঙ্গে ইসমাইল অথবা আল আমিনের কোনো একজনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল বলে জানতে পেরেছি। ওই মেয়েটির সঙ্গে বরুণ তরফদারের আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। এ ঘটনার জের ধরে পুলিশকে ম্যানেজ করে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হতে পারে। আসল ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার জন্য নতুন গল্প তৈরি করে পরিবেশন করা হয়েছে। আমরা পরিবারের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে বলতে চাই, বরুণ তরফদার ও কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শিকদার আক্কাছ আলীকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে হত্যাকাণ্ডের আসল রহস্য উন্মোচিত হবে। পুলিশ সুপার, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং সত্য ঘটনা উদ্ঘাটন করে দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন নিহতের স্বজনরা।
স্বজনদের আহাজারিতে হৃদয়বিদারক দৃশ্য : বুধবার সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ইসমাইল হোসেনের মা রেহেনা বিল্লালের আর্তনাদে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন নিহত ইসমাইল হোসেনের বাবা শেখ বিল্লাল উদ্দিন, বড় মামা মঞ্জুরুল আলম, নিহত আল আমিনের বড় ভাই রবিউল ইসলামসহ আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা।
অভিযোগ অস্বীকার পুলিশের : নিহতের পরিবারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শিকদার আক্কাছ আলী। তিনি বলেন, নিহতের পরিবারের অভিযোগ সত্য নয়। আমরা খবর পেয়ে গণপিটুনিতে মারাত্মক আহত দু’জনকে উদ্ধার করে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করি। চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন। অস্ত্র উদ্ধার ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে দুটি মামলা ও ছিনতাইয়ের কবলে পড়া বরুণ তরফদার বাদী হয়ে আরও একটি মামলা করেছেন। মামলা তদন্তাধীন রয়েছে।

SHARE THIS

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 coment rios: