১০ এপ্রিল, ২০১৫

যশোরে সিনেমা হলগুলো এখন শুধুই স্মৃতি

২৫ লক্ষাধিক জনসংখ্যা অধ্যুষিত যশোর জেলায় এখন সিনেমা হলের সংখ্যা পাঁচ। অথচ এক দশক আগেও এই জেলায় সিনেমা হল ছিল কমপক্ষে ২১টি। কয়েক বছরের মধ্যে ধস নেমেছে সিনেমা হল ব্যবসায়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অশ্লীলতায় ভরা নিম্নমানের ও নকল ছবি নির্মাণ সিনেমা হল থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে দর্শকদের। তা ছাড়া সিনেমা হলগুলোর পরিবেশও ভদ্রলোকের অনুকূলে নয়। নিভু নিভু অবস্থায় যে কয়েকটি হল এখনো টিকে রয়েছে, সেখানে প্রদর্শিত সিনেমার দর্শকদের প্রায় সবাই সমাজের প্রান্তিক শ্রেণীর।
সিনেমা ও সিনেমা হলগুলো এক সময় কত জনপ্রিয় ও পরিচিত ছিল, তার স্বাক্ষর কিন্তু এখনো রয়েছে। হলের অস্তিত্ব না থাকলেও যশোর শহরে এখনো 'চিত্রা সিনেমা মোড়', 'নিরালাপট্টি' নামে স্থান তার সাক্ষ্য দিচ্ছে।
শহরের পুরাতন কসবা এলাকার ষাট বছর বয়সী আব্দুস সালাম সত্তরের দশকের স্মৃতিচারণ করে বলেন, 'সিনেমার টিকিট তখন ছিল মহার্ঘ। টিকিট কাটতে গিয়ে কতবার হাঙ্গামায় জড়িয়েছি! হাত কেটে গেছে, জামা ছিঁড়ে গেছে। তবু রাজ্জাক, শাবানা, ববিতা, আলমগীর, ফারুক বা খান আতার ছবি না দেখে বাড়ি ফিরিনি।'
'আর এখন! কতকাল যে সিনেমা হলমুখো হইনি, স্মরণই করতে পারি না। কী দেখতে যাব? দেখার মতো সিনেমা কি তৈরি হয়? নাকি সিনেমা হলে যাওয়ার পরিবেশ আছে? আক্ষেপের সুরে বলেন আব্দুস সালাম।
গত শতাব্দীর আশির দশকে গড়ে ওঠে যশোরের বিখ্যাত সিনেমা হল 'মণিহার প্রেক্ষাগৃহ'। সে সময়ে বাংলাদেশ তো বটেই উপমহাদেশে এই মানের সিনেমা হল ছিল না। শুধু যশোরবাসীই নয়, দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ আসত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ও মনোহর সাজে সজ্জিত সিনেমা হলটিতে ছবি দেখতে।
সেই মণিহারেরও এখন করুণ দশা। প্রায়ই বন্ধ থাকে। বিশাল সিনেমা হল কমপ্লেক্সটির বড় অংশ এখন আবাসিক হোটেল ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। ভবনের শৈল্পিক কারুকাজ ধ্বংসপ্রায়। গোটা এলাকায় ঘিঞ্জি পরিবেশ। মালিকপক্ষ এ সব বিষয়ে কথা বলতে আগ্রহী নন। তাদের একটাই কথা, 'সিনেমা ব্যবসায় সাংঘাতিক মন্দা। টিকে থাকার জন্য বিকল্প উপায়ে আয়-রোজগারের ব্যবস্থা করেছি।'
ব্যবসা যখন জমজমাট, তখন সিনেমা হল মালিকদের একটি সংগঠনও ছিল যশোরে। এখন তা অস্তিত্বহীন। কথা বলার জন্য সমিতির কোনো কর্মকর্তাকে পাওয়া গেল না।
গত দশকের শুরুতেও যশোরে অন্তত ২১টি সিনেমা হল ছিল। শুধু জেলা-উপজেলা শহর নয়, বর্ধিষ্ণু ব্যবসা কেন্দ্র পুড়াপাড়া, রাজগঞ্জের মতো পাড়াগাঁয়েও গড়ে ওঠে সিনেমা হল। যশোর শহরের নামজাদা মণিহার ছাড়াও ছিল নিরালা, চিত্রা, মানসী, তসবির মহল, যশোর সেনানিবাসে গ্যারিসন সিনেমা হল। উপজেলা বা গঞ্জগুলোর মধ্যে যশোর সদরের রূপদিয়ায় শুভেচ্ছা, কেশবপুরে রূপা, সুচিত্রা, চৌগাছায় উত্তরণ, লাইট হাউজ, অভয়নগরে সোহেলী, বর্ণালী, বিনোদন, বাঘারপাড়ায় শাপলা, মণিরামপুরে পূরবী, মধুমিতা, ঝিকরগাছায় মিতালী, শার্শার নাভারণে রুপালি, সোনালি ও বাগআঁচড়ায় ময়ূরী সিনেমা হল মানুষকে বিনোদন যোগাত। এ ২১টি সিনেমা হলের মধ্যে এখন যশোর শহরে মণিহার, তসবির মহল এবং উপজেলা পর্যায়ে সোহেলী, পূরবী, মধুমিতা ও ময়ূরী টিকে আছে কোনোমতে। যে কোনো সময় প্রাণপ্রদীপ নিভে যেতে পারে এগুলোর।
মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে দর্শক কেন হলবিমুখ হয়ে পড়লত্ম এ প্রশ্নের নানা জবাব সাধারণ মানুষের।
স্বপ্না নামে এক কলেজছাত্রী বলেন, 'দেশী পরিচালকদের সৃজনশীলতা নেই। বিদেশী সিনেমার বাংলা কপি দেখার প্রয়োজনীয়তা বোধ করি না। তা ছাড়া সিনেমা হল ও তার আশপাশের পরিবেশ ভদ্রলোকের অনুকূল নয়। তাই হলে গিয়ে সিনেমা দেখি না।'
আব্দুর রহমান নামে আরেক দর্শকের অভিমত, 'প্রযুক্তির এই যুগে ঘরে বসেই ভুবনবিখ্যাত সিনেমা দেখা যায়। হলে যাওয়ার দরকারটা কী? তা ছাড়া সিনেমার নামে বাংলাদেশে যা তৈরি হচ্ছে, তা রীতিমতো বিরক্তিকর।'
সিনেমা হল ও দেশীয় চলচ্চিত্র রক্ষায় সরকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতাদের যত্নবান হওয়া দরকার বলে মনে করেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট যশোরের সভাপতি হারুন-অর-রশিদ। তিনি বলেন, 'এক সময় নতুন কোন সিনেমা আসছে তা জানার জন্য দর্শকদের মাঝে ব্যাকুলতা ছিল। পাশাপাশি গ্রাম থেকে কোনো কাজে শহরে এলে মানুষ একটি সিনেমা দেখে যাওয়ার তাড়না বোধ করত। এখন সেই দিন নেই।'
তিনি বলেন, 'আমাদের সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো চলচ্চিত্র। সুস্থ চিন্তা-চেতনায় মানুষকে শাণিত করতে চলচ্চিত্রশিল্পকে রক্ষা করা দরকার। ফলে এ কাজে সরকার ও চলচ্চিত্র নির্মাণকারী উভয়কে যত্নবান হতে হবে। আর এ দুটি বিষয় সমন্বিত হলে আমাদের চলচ্চিত্রের হারানো গৌরব ফিরে না এলেও মানুষ সিনেমা হলমুখী হবে বলে আমি মনে করি।'
সিনেমা হলগুলোর অস্তিত্ব একের পর এক বিলীন হলেও তার স্মৃতিচিহ্ন কিন্তু রয়েই গেছে। এখনো যশোর শহরে 'চিত্রা সিনেমার মোড়', 'নিরালাপট্টি', 'মানসী হল' নামে পরিচিতি রয়েছে কয়েকটি এলাকার। যদিও নিরালা সিনেমা হল ভেঙে সেখানে বিশাল আবাসিক এলাকা তৈরি হয়েছে। চিত্রা সিনেমা হল গুঁড়িয়ে নির্মিত হচ্ছে বহুতলবিশিষ্ট বাণিজ্যিক মল। মানসী সিনেমা হল এখন নানা পণ্যের গোডাউন।

SHARE THIS

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 coment rios: