১৩ ফেব, ২০১৫

‘বসন্ত মুখর আজি’

দখিন সমীরণের শিহরণ’ জাগানোর অনুপম দিন এলো। মাতাল হাওয়ায় কুসুম বনের বুকের কাঁপনে, উতরোল মৌমাছিদের ডানায় ডানায়, নিরাভরণ বৃক্ষে কচি কিশলয় জেগে উঠবার আভাসে আর বনতলে কোকিলের কুহুতান জানান দিচ্ছে : ‘আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে..।’ বিপুল ঐশ্বর্যধারী ঋতুরাজ বসন্তের প্রথম দিন। আজ পয়লা ফাল্গুন। ‘আজি দখিন দুয়ার খোলা/এসো হে এসো হে এসো হে আমার বসন্ত’-কবিকণ্ঠের এ প্রণতির মাহেন্দ্র লগন এলো। গণমানুষের কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ভাষায়: ‘ফুল ফুটুক আর নাই ফুটুক/ আজ বসন্ত...’ এমন মধুর সময়ে প্রকৃতি আর প্রাণের আপন উচ্ছ্বাস উত্সবের রঙে-ঢঙে মদিরায় মেতে ওঠে। ফুল ফুটবার পুলকিত এই দিনে বন-বনান্তে কাননে কাননে পারিজাতের রঙের কোলাহলে ভরে উঠবে চারদিক।
আজ হূদয়দল খোলার দিন। কবিমনকেও চাঞ্চল্য ভাসিয়ে নেয়। সেই প্রাচীন প্রাকৃত পেঙ্গলের দিকে তাকালে আমরা দেখবো বসন্তরাজের করতলে ভালোবাসার নৈবেদ্য তুলে দিতে কেমন ব্যস্ত কবিরা। বসন্তের বন্দনা করে একটি পংক্তিও লেখেননি, এমন বাঙালি কবি খুঁজে পাওয়া যাবে না। ভানুসিংহ ঠাকুরের উতলা চিত্তের আকুলতা এমন— ‘বসন্ত আওলরে! মধুকর গুনগুন,/অমুয়া মঞ্জুরী কানন ছাওলরে।/ মরমে বহই বসন্ত সমীরণ, মরমে ফুটই ফুল/ মরমকুঞ্জ’পর বোলই কুহুকুহু অহরহ কোকিলকুল..।’
 শীতের রিক্ততা মুছে দিয়ে প্রকৃতিজুড়ে আজ সাজ সাজ রব। হিমেল পরশে বিবর্ণ প্রকৃতিতে জেগে উঠছে নবীন জীবনের প্রাণোল্লাস। নীল আকাশে সোনাঝরা আলোকের মতই হূদয় আন্দোলিত। আহা! কি আনন্দ আকাশে বাতাসে..। ‘আহা আজি এ বসন্তে/ এত ফুল ফোটে এত বাঁশি বাজে এত পাখি গায়...।
ফাগুনে আগুন লাগে প্রকৃতিতে। ‘কুঁড়িদের ওষ্ঠপুটে লুটছে হাসি ফুটছে গালে টোল’। অশোকে-অশ্বত্থে-শিরীষে-শালে-পিয়ালে হাওয়ার নাচন, আলোর কাঁপন যখন তখন মাতামাতির দিন এখন। ‘অতি মঞ্জুল, শুনি মঞ্জুল গুঞ্জন কুঞ্জে শুনিরে/ শুনি মর্মর পল্লবপুঞ্জে, পিক কূজন পুষ্পবনে বিজনে, মৃদু বায়ু হিলোলবিলোল বিভোল বিশাল সরোবর-মাঝে কলগীত সুললিত বাজে/ শ্যামল কান্তার-’পরে অনিল সঞ্চারে ধীরে রে, নদীতীরে শরবনে উঠে ধ্বনি সরসর মরমর। কত দিকে কত বাণী, নব নব কত ভাষা, ঝরঝর রসধারা...। ঋতুরাজ বসন্তের দিনগুলো অপার্থিব মায়াবী এক আবেশ ঘিরে রইবে বৃক্ষ, লতা, পাখ-পাখালি আর মানুষকে। এ ফাগুন সুখের মতো এক ব্যথা জাগিয়ে দেবে চিত্তে: ‘এতটুকু ছোঁয়া লাগে, এতটুকু কথা শুনি/তাই দিয়ে মনে মনে রচি মম ফাল্গুনী..। মন রাঙিয়ে গুন গুন করে অনেকেই গেয়ে উঠবেন- ‘মনেতে ফাগুন এলো..’। অথবা ‘পলাশ ফুটেছে, শিমুল ফুটেছে, এসেছে দারুণ মাস...কৃষ্ণচূড়া লাল হয়েছে ফুলে ফুলে, তুমি আসবে বলে..।’
সাগর, নদী, ভূ-ভাগ গ্রীষ্মের তাপ বাষ্পে নিঃশ্বাস নিবার আগে এ বসন্তের ফাল্গুনে পায় শেষ পরিতৃপ্তি। নৈসর্গিক প্রকৃতি বর্ণচ্ছটায় বাঙ্ময় হয়ে ওঠে। কচি পাতায় আলোর নাচনের মতই বাঙালি তরুণ মনে লাগে দোলা। হূদয় হয় উচাটন। ফুল ফুটবার পুলকিত দিন বসন্ত। বন-বনান্তে, কাননে কাননে-পারিজাতের রঙের কোলাহল, আর বর্ণাঢ্য সমারোহ। ‘ফুলের বনে যার পাশে যাই তারেই লাগে ভালো..’ কবিগুরুর এই পুলকিত পংক্তিমালা বসন্তেই কি সকলের বেশি মনে পড়ে?
বনে বনে রক্তরাঙা শিমুল-পলাশ, অশোক-কিংশুকে বিমোহিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়: ‘এলো খুনমাখা তূণ নিয়ে/ খুনেরা ফাগুন..।’ আবার তারই কণ্ঠে:‘ফাগুন এলো বুঝি মহুয়া-মালা গলে/চরণ-রেখা তার পিয়াল-তরুতলে/পরাগ-রাঙা চেলি অশোক দিল মেলি’..
বসন্ত বাতাসে পুলকিত ভাটি বাংলার কণ্ঠ শাহ আবদুল করিম গেয়ে ওঠেন:‘বসন্ত বাতাসে..সই গো /বসন্ত বাতাসে/বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ আমার বাড়ি আসে...’
ঋতুচক্র এখন যেন আর পঞ্জিকার অনুশাসন মানছে না। কুয়াশার চাদরমোড়া অকাল শীত তার তীব্রতা ছড়াতে না ছড়াতেই বিদায় নিল। প্রকৃতির দিকে তাকালে শীত বরষার মত বসন্তকেও সহজে চেনা যায়। বাঙালির জীবনে বসন্তের উপস্থিতি সেই অনাদিকাল থেকেই। সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শনেও বসন্ত ঠাঁই পেয়েছে নানা অনুপ্রাস, উপমা, উেপ্রক্ষায় নানাভাবে। আমাদের ঋতুরাজ বসন্তের আবাহন আর পশ্চিমের ভ্যালেন্টাইন-ডে যেন এক বৃন্তের দুটি কুসুম। এ যেন এক সুতোয় গাঁথা দুই সংস্কৃতির এক দ্যোতনা। মানুষের মতই এ সময় পাখিরাও প্রণয়ী খোঁজে। বাসা বাঁধে। রচনা করে নতুন পৃথিবী।
বসন্ত মানেই পূর্ণতা। বসন্ত মানেই নতুন প্রাণের কলরব। কচিপাতায় আলোর নাচনের মতোই বাঙালির মনেও লাগবে দোলা। বিপুল তরঙ্গ প্রাণে আন্দোলিত হবে বাঙালি মন। বাঙালি জীবনে বসন্তের আগমন বার্তা নিয়ে আসে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’। এ বসন্তেই ভাষা আন্দোলনের মধ্যদিয়ে বাঙালির স্বাধীনতার বীজ রোপিত হয়েছিল। বসন্তেই বাঙালি মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেছিল। তাই কেবল প্রকৃতি আর মনে নয়, বাঙালির জাতীয় ইতিহাসেও বসন্ত আসে এক বিশেষ মাহাত্ম্য নিয়ে। বসন্ত হয়ে উঠেছে এক অনন্য উত্সব।
হালে শহরের যান্ত্রিকতার আবেগহীন সময়ে বসন্ত যেন কেবল বৃক্ষেরই, মানুষের আবেগে নাড়া দেয় কমই। তারপরও আজ বসন্তের পয়লা দিনে নানা আয়োজনে আলোড়িত হবে ঢাকা। বিশেষত বাসন্তী শাড়ি আর সফেদ-শুভ্র পাঞ্জাবিতে তরুণ-তরুণীরা বইমেলা, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, উদ্যানমালা, ফাস্টফুড ক্যাফেতে বসন্ত আবাহন করবেন নানা নৈবেদ্যে, নানা অনুষঙ্গে।


SHARE THIS

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 coment rios: