১৬ জানু, ২০১৫

প্রকৃতির অপার দান : খেজুর রস

এসে গেছে শীত। খেজুর গাছের রস সংগ্রহের জন্য গাছিরা পুরোদমে ব্যস্ত। মাঠে থাকা খেজুর গাছের চেহারা বদলে গেছে। রস সংগ্রহের জন্য গাছের আগা বিশেষ পদ্ধতিতে কেটে ফেলা হয়েছে। শীতের শুরুতে এ দৃৃশ্যটিও মনোরম বলে মন্তব্য করেছেন অনেকে। ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে রস সংগ্রহ।

কৃষকরা জানান, কার্তিকের মাঝামাঝি সময় থেকেই পুরোদমে শুরু হয় খেজুর গাছ কাটার ধুম। গাছিরা এখন বেজায় ব্যস্ত। গাছে উঠে গাছের আগা কেটে নেমে এসে আবার আরেক গাছে উঠতে হয়। বেশ কস্টকর ব্যাপার। তারপরও এই কস্টের মধ্যেও আনন্দ লুকিয়ে আছে বলে জানান দামুড়হুদার চিৎলা গ্রামের গাছি ওমর আলী। তিনি বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গার খেজুর গুড় খুবই স্বাদের। খেইতে (খেতে) বেশ মজা। আমরা গুড় তইরি করি, পাটালি তইরি করি। এসব কত্তে কত্তে আমাদের জারকাল (শীতকাল) কাটে। আমরা খুইবি আনন্দ পাই।’
চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা যায়, চুয়াডাঙ্গা জেলায় ১৬৮ হেক্টর জমিতে ৪৭ হাজার ৪০টি খেজুর গাছ রয়েছে। এসব গাছ থেকে চলতি বছর এক হাজার ৪৯০ মেট্রিক টন গুড় উৎপাদন হবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মধুবৃ থেকে গাছিরা সংগ্রহ করবে সুমিষ্ট খেজুর রস, তৈরি হবে লোভনীয় গুড় ও পাটালী। রস জ্বালিয়ে ভিজানো পিঠা ও পায়েস খাওয়ার ধুম পড়বে জেলার প্রতিটি গ্রামীণ জনপদে। দানা, ঝোঁলা ও নলেন গুড়ের স্বাদ ও ঘ্রাণই আলাদা। রসনা তৃপ্তিতে খেজুরের গুড়-পাটালীর কোনো জুড়ি নেই। শীত মৌসুমে গ্রাম বাংলার এক নতুন আমেজের সৃষ্টি হবে।
খেজুর রস, গুড় ও পাটালী লাভজনক হওয়ায় জেলার কৃষকেরা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে খেজুর বাগান সৃজনে ঝুঁকে পড়েছেন। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এ অঞ্চলের কৃষকদের উৎপাদিত খেজুর, গুড় ও পাটালী হতে পারে এক সম্ভবনাময় শিল্প।
দামুড়হুদার মোক্তারপুর গ্রামের মাঠে খেজুর গাছ নিয়ে কথা হচ্ছিল কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে। যারা সারাবছর অন্যান্য চাষাবাদের সঙ্গে জড়িত থাকলেও শীত মৌসুমে ব্যস্ত থাকেন খেজুর গাছ নিয়ে। এমনই একজন কৃষক আবুল হাশেম বলেন, ‘চিৎলা, হাতিভাঙ্গা, মোক্তারপুর এসব গ্রামে অনেক খেজুর গাছ আচে (আছে)। জমিতে খেজুর গাছ থাকা বেশ নাবের (লাভজনক)। গুড় তইরি করে নগত টেকা। নাব (লাভ) হয়। কুনু নোকসান নাই।’
এ বছর আগে ভাগেই  শীতের আমেজ  শুরু হওয়ায় গাছিদের জন্য ভালো হয়েছে। এ জেলায় এখনও পর্যন্ত শীত তেমন জেঁকে না বসলেও গাছিরা খেজুর গাছের ডাল-পালা পরিষ্কার, গাছি দা তৈরি, দড়ি ও মাটির ভাঁড় কেনা , রস জ্বালানোর স্থান ঠিক করাসহ যাবতীয় কাজ পুরোদমে চালিয়ে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যেই বেশিরভাগ খেজুরগাছ কেটে পরিস্কার করা হয়েছে।
চুয়াডাঙ্গার এমন কোনো গ্রাম নেই  যেখানে কম-বেশি খেজুর গাছ নেই।  এ সব গ্রামের গাছিরা খেজুর রস সংগ্রহের জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। সরকার অন্যান্য ফসলের মত উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নেয় না গ্রাম বাংলার গৌরব আর ঐতিহ্য গাঁথা খেজুর গাছের চাষ সম্প্রসারণে। এ জেলার চাষীরা নিজেদের জমিতে বর্তমানে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে খেজুর বাগান গড়ে তুলছেন এবং খেজুর রস, গুড় ও পাটালীর চাহিদা অনেকাংশেই পূরণ করতে সক্ষম হচ্ছেন। অনেকের জমিতে আবার অনাদর-অবহেলায় খেজুর গাছ জš§ নিয়ে একা একাই বড় হয়ে উঠেছে। জমিতে অন্যান্য চাষাবাদের সঙ্গে জমিতে থাকা খেজুর গাছ থেকে যা পাওয়া যায় তা বাড়তি পাওনা বলে মন্তব্য করেছেন অনেক কৃষক।

জেলার বেশ কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, খেজুর গাছিরা গাছ থেকে রস আহরণের জন্য গাছের ডাল পালা কেটে পরিষ্কার করে গাছ তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। প্রথম পর্যায়ে গ্রামীণ জনপদে সন্ধার রস (সাজো রস) খাওয়ার ধুম পড়বে।
গ্রামীণ বাংলার সান্ধ্যকালীন জীবন আনন্দের হয়ে উঠছে। গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য খেজুর রস, গুড় ও পাটালীর বর্হিবিশ্বেও ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। অভিজ্ঞ মহলের বিশ্বাস, খেজুর রস, গুড় ও পাটালী আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাতকরণ করার পর তা বিদেশে সরবরাহ করে প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।
শীতকালে শহরের মানুষ সারা দিনের কাজ শেষে সন্ধায় রস খেতে গ্রামে ছুটে আসেন। অন্যদিকে গ্রামের বধূরা রস দিয়ে পিঠা পায়েস তৈরী করতে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন।  যত বেশি শীত পড়বে রস তত বেশী মিষ্টি হবে রস।
চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক হরিবুলা সরকার বলেন, ‘এ জেলায় প্রচুর খেজুর গাছ রয়েছে। যেগুলো কোনো বাড়তি যতœ বা পরিচর্যা ছাড়াই বেড়ে উঠেছে। এ অঞ্চলের খেজুর রস, গুড় ও পাটালীর বিরাট খ্যাতি ও যশ রয়েছে। কৃষকদের উৎপাদিত খেজুর রস, গুড় ও পাটালী বিশেষ প্রক্রিয়াজাত করণের মাধ্যমে বিদেশে রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যেতে পারে। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে খেজুর গাছের বাগান সৃজন করতে পারলে খেজুর রস, গুড় ও পাটালী হতে পারে এক সম্ভাবনাময়ী শিল্প।’
বেকায়দায় রংপুরের গাছিরা
‘বাঁদুরে হামার কপাল খাইছে। হেই (বাঁদুরে) খায় বলে মাইনষে খেঁজুরের রস খাবার চায় না।’ শীতকালের প্রধান আকর্ষণ খেঁজুরের রস বাজারে বিক্রি না হওয়ায় আক্ষেপ করে এমন কথা বলেন, রংপুর নগরীর সাতমাথা বাজারের রস বিক্রেতা ইসমাইল হোসেন। নিপা ভাইরাস আতংকে বাজারে খেঁজুর রসের চাহিদা কমে যাওয়ায় বেকায়দায় পড়েছেন রংপুরের হাজারো গাছি।
জানা যায়, রংপুরের গ্রামাঞ্চলে সহস্রাধিক গাছি রয়েছেন। যারা বাপ-দাদার পেশাকে আঁকড়ে ধরে প্রতি বছর শীত মৌসুমে খেঁজুর গাছের রস নামিয়ে বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। বছর তিনেক আগে পাশের লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা উপজেলায় নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বেশ কয়েকজন মারা যায়। রংপুর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে নিপা ভাইরাস। ওই সময় রোগ সনাক্তের পর বাঁদুরকে নিপা ভাইরাসের অন্যতম বাহক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এছাড়া এ ভাইরাসের হাত থেকে রক্ষায় বাঁদুরে খায় এমন খাবার থেকে বিরত থাকার প্রচারণা চালানো হয়। সেই থেকে চাহিদা কমে যায় খেজুর রসের।
সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, খেজুর গাছগুলোতে ঝুলছে রসের হাঁড়ি। শীত মৌসুমে গাছিরা রসের আশায় গাছ কেটে হাঁড়ি বসিয়েছেন। প্রচুর রস নামলেও বাজারে চাহিদা না থাকায় হতাশ হয়ে পড়েছেন তারা।
কাউনিয়া উপজেলার শহীদবাগ গ্রামের গাছি একরামুল হকের পেশাই হলো খেজুর গাছ থেকে রস নামিয়ে বাজারে বিক্রি করা। তিনি জানান, প্রতি বছর শীত মৌসুমের জন্য ৫০ থেকে ৬০টা খেজুর গাছ লিজ অথবা চুক্তিতে নেওয়া হয়। এ বছর রস বিক্রি না হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তিনি। তারাগঞ্জ উপজেলার ইকরচালি ইউনিয়নের ওকরাবাড়ি এলাকার গাছি সৈয়দ আলী বলেন, ‘পাঁচ টাকায় এক গ্লাস রস বেচাইলে (বিক্রি করলে) লাভের মুখ দেখা যায়। কিন্তু এ বছর বাজারে আগাম আনলেও দুই টাকাতেও মানুষ খেজুরের রস খাবার চায় না।’ এমন অবস্থা চলতে থাকলে বাধ্য হয়ে পেশা বদল করতে হবে বলে গাছিরা জানান।
চিকিৎসকরা জানান, নিপা ভাইরাসের বাহক বাঁদুর। রাতের বেলা গাছ থেকে হাঁড়িতে রস পড়ার সময় মুখ লাগিয়ে বাঁদুরে খায়। এ কারণে ভাইরাস ছড়াতে পারে বলে মানুষের মাঝে আতংক ছড়িয়ে পড়েছে। তাছাড়া অনেক এলাকা থেকে দিনদিন খেজুর গাছ হারিয়ে যাচ্ছে। খেজুর গাছ কেটে ইট পোড়ানো কাজে ব্যবহার করছেন। এর ফলে ঐতিহ্যবাহি এ গাছটি অদুর ভবিষ্যতে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই দেশব্যাপি খেজুর গাছ লাগানো ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ মহল।

SHARE THIS

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 coment rios: