১০ জানু, ২০১৫

ই-বর্জ্যে হুমকিতে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ


প্রতিদিনই বাজারে আসছে নিত্যনতুন প্রযুক্তিপণ্য। কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, টেলিভিশন, রেফ্রিজেরেটর, ট্যাবলেটসহ আরো কত কী! আর এর ফলে কয়েকদিন আগেই বাজার মাত করা প্রযুক্তিপণ্য হয়ে যাচ্ছে ক্রেতাদের কাছে পুরনো। চাহিদা না থাকায় আবর্জনা হিসেবে সেগুলোর ঠাঁই হয় ডাস্টবিনে। এগুলোতে থাকে বিষাক্ত রাসায়নিক, যা মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য খুবই ক্ষতিকর। ব্যবহারের অযোগ্য পুরনো এসব ইলেকট্রনিক সামগ্রী ই-বর্জ্য (ইলেকট্রনিক ওয়েস্ট) হিসেবে পরিচিত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ইলেকট্রনিক জিনিসে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ সীসা, ক্যাডমিয়াম, পারদ, ক্রোমিয়াম, পলিব্রোমিনেটেড বাইফিনাইল থাকে। যা মানুষের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি করে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় কিডনি ও লিভার। এসব রাসায়নিকের প্রভাবে নানা ত্রুটি নিয়ে জন্মাচ্ছে মানবশিশু।
ঢাকা সিটি করপোরেশন উত্তরের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন বিপন কুমার সাহা বলেন, ই-বর্জ্যগুলোকে সাধারণ বর্জ্যের সাথেই রাখা হচ্ছে। আলাদাভাবে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কোন নীতিমালা বা পদ্ধতি নেই। এতে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে বলেও তিনি জানান।অন্যদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা) কাজী সারওয়ার ইমতিয়াজ হাশমী বলেন, ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় একটি খসড়া আইন তৈরি করে রিভিউ (পর্যালোচনা) এর জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া ই-বর্জ্য রিসাইক্লিং করার জন্য জাপানের একটি সংস্থা কাজ করার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তারা ইতিমধ্যে জরিপের কাজ শুরু করেছে বলেও তিনি জানান।
সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশ থেকে পুরনো কম্পিউটার ও ল্যাপটপসহ অন্যান্য ইলেকট্রনিক সামগ্রী আমদানির পরিমাণ বেড়েছে। ঢাকাসহ সারাদেশে এগুলো দেদারসে বিক্রি হচ্ছে। সাধারণত আমেরিকা, দুবাই, কোরিয়া, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে এগুলো আমদানি করা হয়। রাজধানীর মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারসহ এলিফ্যান্ট রোডের বিভিন্ন কম্পিউটারের দোকানে পাওয়া যায় পুরনো কম্পিউটার। এলিফ্যান্ট রোডের কম্পিউটার ব্যবসায়ী সোহেল জানান, তারা প্রতি সপ্তাহে বেশ কয়েকটি পুরনো কম্পিউটার বিক্রি করেন। এসব কম্পিউটার তারা বিদেশ থেকে লট হিসেবে কিনে আনেন।
এমনকি পত্রিকা, ইন্টারনেটেও পুরনো কম্পিউটার, টেলিভিশন, মোবাইল ফোনের বিজ্ঞাপন দেয়া হচ্ছে। এগুলোর থাকে না কোনো ওয়ারেন্টি-গ্যারান্টি।
ই-বর্জ্যের সঠিক পরিসংখ্যান নেই
বাংলাদেশে প্রতিবছর কি পরিমাণ ই-বর্জ্য সৃষ্টি হয় তার কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তবে এটি স্পষ্ট গত কয়েক বছরে দেশে নতুন নতুন প্রযুক্তিপণ্য ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। এর সঙ্গে বেড়েছে ই-বর্জ্যের পরিমাণও। মোবাইল সেট, কম্পিউটার, টেলিভিশনসহ বাসা-বাড়িতে ব্যবহূত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি থেকে দেশে প্রতিবছর হাজার হাজার টন ই-বর্জ্য সৃষ্টি হয়ে থাকে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে দেশে প্রায় ১০ কোটি মোবাইল ফোন ব্যবহূত হচ্ছে। এছাড়াও আছে বিভিন্ন প্রকার নিত্যব্যবহার্য ইলেক্ট্রনিক সামগ্রী। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের ই-বর্জ্যের তালিকায় পরিত্যক্ত মোবাইল ব্যাটারি উল্লেখযোগ্য। পরিত্যক্ত এসব মোবাইলের ব্যাটারি যেখানে সেখানে ফেলার ফলে তা পরিবেশের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। মোবাইল ব্যাটারিতে আছে লিথিয়াম, যা মাটির উর্বরতা শক্তি হ্রাস করে। দেশে কোটি কোটি ব্যবহূত মোবাইল ফোন মাটির সঙ্গে মিশে পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
অবাধে আসছে পুরনো পণ্য
বর্তমানে বাংলাদেশে মোবাইল ফোনের বাজারের একটা বিরাট অংশ দখল করে রেখেছে চীন থেকে আমদানি করা কম মূল্যের মোবাইল ফোন সেট। মাত্র কয়েক হাজার টাকায় পাওয়া যাওয়ায় বিধায় ব্যাপক হারে বিক্রি হচ্ছে এসব বাহারি মোবাইল ফোন। কিন্তু নিম্নমানের প্রযুক্তি ব্যবহূত হওয়ায় খুব অল্প সময়ের মধ্যে তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মেরামত অথবা রিসাইকেলের অভাবে শেষ পর্যন্ত এগুলোর আশ্রয় হচ্ছে ডাস্টবিনে। সকল প্রকার নষ্ট ও পরিত্যক্ত মোবাইল ব্যাটারি ফেলা হচ্ছে যত্রতত্র। বিদেশ থেকে মোবাইল আমদানির ক্ষেত্রে আমদানি নীতিমালা থাকলেও মানছে না একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীরা। কর ফাঁকি দিয়ে চোরাই পথে এসব প্রচুর মোবাইল, কদিন ব্যবহারের পর সেগুলো পরিণত হচ্ছে ই-বর্জ্যে। 
স্বাস্থ্য ও পরিবেশ ঝুঁকিতে
ই-বর্জ্যের মধ্যে বেশি পরিমাণে থাকে রেজিন, ফাইবার অক্সাইড, পিসিবি, পিভিসি, প্লাস্টিক, সীসা, টিন, সিলিকন, কার্বন এবং লোহা। অল্প পরিমাণে পাওয়া যায় ক্যাডমিয়াম, পারদ একথ্যালিয়াম। এদের মধ্য হতে কিছু পুরনো পণ্য পুনর্ব্যবহার করা গেলেও বাকিগুলো বর্জ্য হিসেবে পরিত্যক্ত হয় এবং এ সকল বর্জ্যের মধ্যে কিছু আবার পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর যেমন সীসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম, বেরিলিয়াম, নাইট্রাস অক্সাইড এবং ব্রোমিনযুক্ত অগ্নি প্রশমক দ্রব্য। টিভি বা কম্পিউটার মনিটরে ব্যবহূত ক্যাথেড রে টেব (সিআরটি) হলো সবচেয়ে ক্ষতিকর ই-বর্জ্য। কারণ, এর মধ্যে উপরোক্ত ক্ষতিকর পদার্থের অনেকগুলো উপাদান উপস্থিত এবং সিআরটি রিসাইকেল করাও খুব ব্যয়সাপেক্ষ।
কম্পিউটারের বডি তৈরিতে ব্যবহূত ব্রোমিনেটেড ফ্লেম রিটারডেন্ট প্লাস্টিক ধংস করে মানবদেহের ডিএনএ। এছাড়া সীসাসহ অন্যান্য উপাদানের ক্ষতি করার সীমাও অনেক। বিভিন্ন চিপে ব্যবহূত ক্যাডমিয়াম ক্ষতি করে কিডনির। মার্কারি মস্তিষ্কের কোষের জন্য ক্ষতিকর।
কম্পিউটার ও মোবাইল ফোন তৈরির ক্ষেত্রে ব্যবহূত হয় সিলভার, সিলিকন, তেজস্ক্রিয় পদার্থসহ নানা ধরনের রাসায়নিক পণ্য। মোবাইল ফোনের ব্যাটারিতে রয়েছে সীসা, নিকেল এবং ক্যাডমিয়ামের মতো ভারি ধাতু।
ই-বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা ও রিসাইকেলিং
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নষ্ট প্রযুক্তি পণ্য সংগ্রহ ও রিসাইকেল না করলে ব্যাপকহারে পরিবেশ দূষণ হবে। ই-বর্জ্যের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বর্তমানে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে গ্রিন ইকোনমি গড়ার সময় এসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ই-বর্জ্য বিষয়ক নীতি প্রণয়ন দরকার। এছাড়া শিল্পোন্নত দেশগুলো থেকে ইলেকট্রনিক পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে কোনো নীতিমালা নেই। যার কারণে শিল্পোন্নত দেশগুলো থেকে অবাধে ই-বর্জ্য চলে আসছে। বিশেজ্ঞরা বলছেন, ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে নীতিমালা থাকলে দেশে পুরনো কম্পিউটার এবং ইলেক্ট্রনিক সামগ্রীর নামে বর্জ্য আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেক্ট্রিক অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী চৌধুরী বলেন, ক্ষতিকর ইলেক্ট্রনিক বর্জ্যের মধ্যে বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় রাসায়নিক উপাদান থাকে, যা মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। ই-বর্জ্যের ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া বিভিন্ন রকমের ও দীর্ঘমেয়াদী হয়ে থাকে। এ প্রতিক্রিয়া খুবই ভয়াবহ বলেও উল্লে­খ করেন তিনি। রাসায়নিক পদার্থ মাটি, পানি ও বায়ুতে মিশে দীর্ঘদিন টিকে থাকবে ও ভবিষ্যতে মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। এতে শিশুর বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
একই বিভাগের অধ্যাপক ড. আমিনুল হক জানান, উন্নত বিশ্বে ই-বর্জ্য রিসাইক্লিং করার ব্যবস্থা থাকলেও এদেশে এমন কোন ব্যবস্থা নেই। ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মাটি ও পানিতে মিশে গিয়ে মানবদেহে প্রবেশ করে মানুষের ক্ষতি করে। পরিবেশ ও মানুষের উপর এর প্রভাব স্বল্পমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে বলে তিনি জানান।

SHARE THIS

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 coment rios: