২৩ জানু, ২০১৫

যশোরের হারানো ইতিহাসের সূত্র ও একজন নূরুল ইসলাম

যশোর বাংলার একটি প্রাচীন রাজ্য বা জনপদের নাম— এ কথা কে না জানে! এমনকি জানে যশোর নামকরণ কবে হলো। জসর, যশোহর, যশোর শব্দটি ইতিহাসে কীভাবে আজকের যশোরে স্থির হলো, সে কথাও অজানা নয়! নতুন করে জানতে চাইলে খুব একটা বেগ পেতে হবে না। কিন্তু যে প্রশ্ন আজ এ যশোর নিয়ে উপস্থাপনার পেছনে তাগিদ সৃষ্টি করেছে তা হলো, কেন এখানে আজকের যশোর শহর সৃষ্টি হলো? যশোরের ইতিহাস আর এ জনপদের ইতিহাসের বয়সকাল কি একই? যশোর নামকরণের আগেইবা এ জনপদের নামকরণ কি ছিল? আদৌ কি এখানে কোনো জনপদ ছিল?
জানা যায়, যশোর নামের আগে এ শহরের নাম ছিল মুড়লি-কসবা। মুড়লি প্রাচীনকাল হতেই বিখ্যাত শহর। ভৈরব তখন বেগবান প্রবল নদ। বর্তমান শহরের কেন্দ্রবিন্দু থেকে পূর্ব দিকে দুই কিলোমিটার দূরে ভৈরব নদের দক্ষিণে অবস্থিত স্থানের নাম মুড়লি।
জানা যায়, প্রাচীন বাংলা যখন রাঢ়, সুম্ম, পুণ্ড্র বঙ্গ, বরেন্দ্র, সমতট, হরিকেল, গৌড়, তাম্রলিপ্ত রাষ্ট্রে বিভক্ত ছিল; সে সময় গৌড়পুর, পুণ্ড্রনগর, পুণ্ড্রবর্ধন, তাম্রলিপ্ত, সোমপুর, বসুবিহার, বর্ধমান, পুঙ্কর্ণ, ইদিলপুর, চন্দ্রদ্বীপ বা ইন্দ্রদ্বীপ, মুড়লি কসবা প্রভৃতি সুপ্রাচীন শহর বা নগর বলে পরিচিত ছিল। আর এসব ইতিহাস খুঁজে পেয়েছেন যশোর জেলা পরিষদের সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী এসএম নূরুল ইসলাম। তিনি জেলা পরিষদের ১২৭ বছরের হারানো ও দুর্লভ সব ইতিহাস উদ্ধার করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। যশোর জেলা পরিষদের ১২৭ বছরপূর্তি সামনে রেখে তিনি এ কাজ করেন। যশোর জেলা পরিষদ প্রকাশিত শতবর্ষী স্মরণিকায় এসব দুর্লভ তথ্য-উপাত্ত সংযোজিত হয়েছে।
প্রকৌশলী নূরুল ইসলাম জানান, কাজ করতে গিয়ে জেলা পরিষদের রেকর্ডরুমে তিনি খুঁজে পান উইপোকায় খাওয়া জরাজীর্ণ নথিপত্র। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো অবিভক্ত যশোর জেলার মানচিত্র। যশোর নামে আগে একটি রাজ্য ছিল। ১৭৮১ সালে ব্রিটিশ সরকার যশোর রাজ্যের বিলুপ্তি ঘটিয়ে অবিভক্ত বাংলায় যশোরকে প্রথম জেলা ঘোষণা করেন। সে সময় নদীয়া, ২৪ পরগনা, খুলনা, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর ও পাবনার বেশির ভাগ এলাকা যশোর জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরে যশোরের আয়তন কমলেও জেলাটি বনগাঁ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। সে মানচিত্রও তিনি খুঁজে পেয়েছেন।
নূরুল ইসলাম জানান, একটি ঐতিহাসিক ছবির জন্য তিনি ছয় মাস চেষ্টা করে এ নথিগুলো ভারত থেকে সংগ্রহ করেছেন।
আজকের খুলনা জেলা একসময় যশোর জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। যশোর জেলা সৃষ্টির ৬১ বছর পর ১৮৪২ সালে খুলনাকে মহকুমা করা হয়। এরও ৩৯ বছর পর অর্থাত্ যশোর জেলা প্রতিষ্ঠার ১০০ বছর পর খুলনাকে জেলা করা হয়।
নুরুল ইসলাম খুঁজে পেয়েছেন যশোর-খুলনার যুক্ত মানচিত্রটি। এ মানচিত্রগুলো গবেষকদের কাছে অনন্য দলিল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে গিয়েছিল জেলা পরিষদের সেবাদানকারী ১০ জন চেয়ারম্যান ও ১৩ জন ভাইস চেয়ারম্যানের নাম-পরিচয়। তিনি প্রায় সবার ছবিসহ পরিচিতি এবং স্বাক্ষর উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন। একইসঙ্গে প্রশাসনিক কর্মকর্তা, প্রকৌশলীসহ সেবাদানকারী অন্যদের নাম-পরিচয় তিনি উদ্ধার করেছেন।
রেকর্ডরুমে খুবই জরাজীর্ণ অবস্থায় সবার ছবি এবং পরিচিতি খুঁজে পান নুরুল ইসলাম।
১৮৮৫ সালের লোকাল সেলফ গভর্নমেন্ট অ্যাক্টের আওতায় জিলা বোর্ড সৃষ্টি করা হয়। এক বছর পর ১৮৮৬ সালের ১ অক্টোবর যশোর জিলা বোর্ড গঠন করা হয়। ১৯৫৯ সালে এর নামকরণ করা হয় ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল। ১৯৭৬ সালের স্থানীয় সরকার আইনে জেলা পরিষদ নামকরণ হয়। বর্তমানে জেলা পরিষদ আইন ২০০০ (২০০০ সালের ১৯ নম্বর আইন) অনুযায়ী পরিচালিত হয়। যশোর জেলা পরিষদের বর্তমান ভবনটি নির্মাণ করা হয় ১৯১৩ সালে। সে বছর ৩ মার্চ এ ভবন উদ্বোধন করেছিলেন তত্কালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ঔঐ খরহফংধু ঊংয় (গঅ ওঈঝ)। এসব তথ্য কারো জানা ছিল না। কোনো বই-পুস্তকেও নেই। নূরুল ইসলাম সবই উদ্ধার করে জনসমক্ষে উপস্থাপন করেছেন।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুতে ১৯৪১ সালের ১২ আগস্ট অনুষ্ঠিত যশোর জেলা পরিষদের সভায় শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। প্রস্তাবের একটি কপি কবির ছেলে রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে পাঠানো হয়। পত্রটি পেয়ে তিনি সাধুবাদ জানিয়ে জেলা পরিষদকে একটি চিঠি দেন। ওই চিঠিটি জেলা পরিষদের ১৩ সেপ্টেম্বরের সভার কার্যবিবরণীতে লিপিবদ্ধ করা হয়। উদ্ধার করা সেই চিঠি ও কার্যবিবরণীকে গৌরবময় স্মৃতি হিসেবে মূল্যায়ন করছেন সুধীজন।
নূরুল ইসলামের উদ্ধার করা দুষ্প্রাপ্য নথিপত্র প্রসঙ্গে আর্কাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদফতরের পরিচালক আবদুল বারী চৌধুরী জানান, নূরুল ইসলামের পরিশ্রমের ফল পাঠক, গবেষক ও ইতিহাসবিদদের দুষ্প্রাপ্য তথ্য সংগ্রহে সহযোগিতা করবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এসএম মান্নান জানান, এটি সাধারণ স্মারকগ্রন্থ নয়, হাজার বছরের গৌরবময় ঐতিহ্যের লীলাভূমি যশোরের সামগ্রিক পরিচয়বাহী একটি ঐতিহাসিক দলিল।
ইতিহাস গবেষক আশরাফ আলী বলেন, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গবেষকদের খোরাক জোগাবে নূরুল ইসলামের শতবর্ষী স্মারকগ্রন্থটি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ডিন প্রফেসর ড. অনিক মাহমুদ বলেন, নূরুল ইসলাম অসাধ্য সাধন করেছেন। এসব দুষ্প্রাপ্য তথ্য-উপাত্ত ভবিষ্যতে গবেষণার কাজে ব্যবহূত হবে।
নূরুল ইসলাম বলেন, জাতীয় আর্কাইভসে প্রশিক্ষণ নেয়ার সময় ঐতিহাসিক বিষয়ের প্রতি তার আগ্রহ জন্মে। তারই ধারাবাহিকতায় যশোর জেলা পরিষদের গৌরবময় ইতিহাস উদ্ঘাটনে তিনি আগ্রহী হন। এ কাজে জেলা পরিষদের প্রশাসক শাহ হাদিউজ্জামান, সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জাবেদ আহমদ ও বর্তমান প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সঞ্জয় কুমার বণিক তাকে প্রেরণা জোগান। আর তাকে সার্বিক সহযোগিতা করেছেন জেলা পরিষদের সার্ভেয়ার আশরাফ হোসেন মঞ্জু।
নূরুল ইসলাম জানান, যশোর জেলা পরিষদে এখনো যে ঐতিহাসিক তথ্যসমৃদ্ধ ডকুমেন্টস জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে, তা সংরক্ষণের জন্য একটি আর্কাইভস তৈরি করা জরুরি।
প্রকৌশলী নূরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের কোনো জেলা পরিষদ অদ্যাবধি এ রকম কোনো স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করেনি। কিংবা ঐতিহাসিক মানচিত্রও কোথাও পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ!
এসএম নূরুল ইসলাম বুয়েট থেকে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার (সিভিল) ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯১ সালে এলজিইডিতে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। ২০০৯ সালে সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী পদে যোগ দেন যশোর জেলা পরিষদে। তিনি বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের ফেলো। ১৯৬৩ সালের ২০ নভেম্বর তার জন্ম। তার গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার মুণ্ডুমালা গ্রামে। তার বাবার নাম মরহুম মকছেদ আলী তরফদার। মাতার নাম আনোয়ারা খাতুন। ভাইবোনদের মধ্যে তিনি চতুর্থ। নূরুল ইসলাম দুই মেয়ের জনক।
যশোর জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সঞ্জয় কুমার বণিক বলেন, দেশের এ সুপ্রাচীন ইতিহাস-ঐতিহ্য অনুসন্ধান অর্থহীন নয়। নূরুল ইসলামের মতো আমরাও খুঁজতে পারি আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের লোকসাধারণের হারানো কৃষ্টি-কালচার।

SHARE THIS

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 coment rios: