বিজয় আমার অহংকার : যশোর

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিগর্ভা জেলা যশোর। প্রাচীন জেলাগুলোর মধ্যে যশোরেই প্রথম উড়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। ৬ ডিসেম্বর শত...

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিগর্ভা জেলা যশোর। প্রাচীন জেলাগুলোর মধ্যে যশোরেই প্রথম উড়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। ৬ ডিসেম্বর শত্রুমুক্ত হবার পরদিন মুক্তিবাহিনী মুক্ত শহরে বীরের বেশে স্বাধীন দেশের মাটিতে পা রাখে। মুক্তিবাহিনীর সাথে শহরবাসীও বিজয়োল্লাসে নেমে আসে রাস্তায়। ‘জয় বাংলা’ ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ শ্লোগানে মুখর করে তোলে চারদিক। বিজয়ের এই আনন্দের জন্য সারাদেশের মতো যশোরবাসীকেও দিতে হয়েছিল চরম মূল্য।
বিক্ষোভের শুরু : গণপরিষদের অধিবেশন ৩ মার্চ ঢাকায় বসবার তারিখ নির্ধারিত ছিল। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ১ মার্চ আকস্মিকভাবে গণপরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। এতে ছাত্র-জনতা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। যশোর জেলা ছাত্রলীগ এর প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর’ শ্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে চারিদিক। ২ মার্চ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন। এদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় ছাত্র-সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে (পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ ডাকসু সমন্বয়ে গঠিত) বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়। ২ মার্চ সারাদেশে জনগণ স্বাধীনতার দাবিতে রাস্তায় নেমে আসে। বাঁধ ভাঙা জোয়ারের মতো উত্তাল হয়ে ওঠে দেশ। রাজধানী ঢাকার মতো ফুঁসে ওঠে সকল আন্দোলন-সংগ্রামের অন্যতম সুতিকাগার যশোর। ২ মার্চ সারাদিন যশোর শহরের বিভিন্ন স্থানে জনতার স্বতঃস্ফূর্ত মিছিল ও বিক্ষোভ চলতে থাকে। জনতা লাঠি হাতে নেমে আসে রাজপথে। 
৩ মার্চ বেলা ১১টায় জেলা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দের ডাকে ছাত্র-জনতার বিশাল মিছিল যশোর শহর প্রদক্ষিণ করে ঈদগাহ ময়দানে এসে প্রতিবাদ সমাবেশে মিলিত হয়। এতে যশোর সদরের গণপরিষদ সদস্য মোশাররফ হোসেন এলএলবিসহ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।  সভা শেষে একটি মিছিল যশোর টেলিফোন এক্সচেঞ্জের সামনে এলে টেলিফোন এক্সচেঞ্জ পাহারায় থাকা পাকসেনাদের দেখে জনতা টেলিফোন ভবনে ইট-পাটকেল ছুঁড়লে সেনা সদস্যরা গুলিবর্ষণ শুরু করে। এতে এক্সচেঞ্জের অদূরে গোলপাতার ঘরে অবস্থানকারী মধ্যবয়সী নারী চারুবালা কর নিহত হন। মুক্তিযুদ্ধে তিনিই যশোরের প্রথম শহীদ। ঐ সময় গুলিতে আহত হন কয়েকজন। যশোর সদর হাসপাতালে লাশের ময়না তদন্তের পর বিকেল ৪টা-৫টার দিকে তার লাশ নিয়ে যাওয়া হয় নীলগঞ্জ শ্মশানে। এ সময় যশোর সদর হাসপাতাল থেকে নীলগঞ্জ পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকা ছিল লোকে লোকারণ্য।
মুক্তিযোদ্ধা অশোক রায় জানান, ৪ মার্চ যশোর কালেক্টরেট ভবনে পাকিস্তানি পতাকা উড়ছে দেখে ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ সেখানে আসেন এবং ছাত্রনেতা আবদুল হাইকে ভবনে উঠে যেয়ে পতাকাটি নামিয়ে আনতে বলেন। পতাকাটি নামিয়ে এনে ভবনের নিচে (বর্তমান কালেক্টরেট হোটেলের সামনে) পোড়ানো হয়। এ সময় ছাত্রলীগ নেতা আলী হোসেন মনি, রবিউল আলম, শেখ আব্দুস সালাম, মিকাইল হোসেন মিন্টু, আবু সাদ সন্টু, মহিউদ্দিন আহমেদ মহিন, সরদার লুত্ফর রহমান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। একইদিন স্বাধীনতার জন্য ব্যাকুল ছাত্রলীগ নেতারা জজকোর্ট ভবনের পাশে সাংবাদিক মাহমুদ উল হকের ‘নতুন দেশ’ পত্রিকা অফিসে বসে স্থানীয়ভাবে স্বাধীনতার পতাকা ডিজাইন করেন। এটা ছাত্রলীগ নেত্রী সালেহা বেগমের পুরাতন কসবার বাড়িতে গোপনে তৈরি করা হয়। ঐ দিন রাতে পতাকাটি ঈদগাহ ময়দানে টাঙিয়ে দিয়ে পোস্টারিং করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া হয়। এসবই ইতিহাস হলেও তথ্য হিসেবে আড়ালে রয়ে গেছে। 
২৫ মার্চ যশোর সেনানিবাস থেকে সেনা সদস্যরা শহরে ঢোকার সময় মুক্তিকামী সাধারণ মানুষের চোরাগোপ্তা হামলার শিকার হয়। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর গণপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট মশিউর রহমানকে শহরের সিভিল কোর্ট এলাকার বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায়। সেনানিবাসে পরে তাকে হত্যা করা হয়। ৩০ মার্চ পাকসেনারা যশোর শহর ছেড়ে সেনানিবাসে ফিরে যায়। এ সময় জনতা শহরে নেমে আসে। ঐ দিন বিদ্রোহী পুলিশদের সহায়তায় ছাত্র-জনতা যশোর পুলিশ লাইনের অস্ত্রাগার লুট করে মুক্তিকামী মানুষের হাতে তুলে দেয়। তত্কালীন ইপিআর, আনসার বাহিনী ও মুজাহিদ বাহিনীও বিদ্রোহ করে স্বাধীনতাকামী মানুষের পাশে অবস্থান নিলে কার্যত পাকসেনারা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। মুক্তিযোদ্ধারা ক্যান্টনমেন্টের চারদিক আরিফপুর, কাশিমপুর, খয়েরতলা, শানতলা জুড়ে অবস্থান নেন। এতে এলাকার উত্তরাঞ্চলের মানুষ উদ্বেলিত হয়ে ওঠেন। তারা নিজেদের বাড়ি থেকে ডাব, রুটি, চিড়া এনে মুক্তিযোদ্ধাদের আপ্যায়ন করেন। ঐ দিনই (৩০ মার্চ) ক্যাপ্টেন হাফিজউদ্দীনের নেতৃত্বে যশোর সেনানিবাসের বাঙালি সেনারা বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ৩১ মার্চ নড়াইল থেকে হাজার হাজার মানুষের একটি জঙ্গী মিছিল আসে যশোরে। শহরবাসীর সহায়তায় সশস্ত্র মিছিলটি হামলা চালায় যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে। মুক্তি পান সকল রাজবন্দী।
২ এপ্রিল শহরবাসী বিহারী নিধন শুরু করে। বাঙালিদের হাতে কয়েকশ’ বিহারীর মৃত্যু হয়। মুক্তিযোদ্ধা রবিউল আলমের মতে, ৩০ মার্চ থেকে ৩ এপ্রিল পর্যন্ত যশোর শহর মুক্তিকামী মানুষের দখলে থাকে। ৪ এপ্রিল পাকবাহিনী তাদের দখল পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে।
যশোর ছিল মুক্তিযুদ্ধের ৮ নম্বর রণাঙ্গন। কমান্ডার ছিলেন আবু ওসমান চৌধুরী ও মেজর মঞ্জুর। ১০৭ নম্বর ব্রিগেড মোতায়েন ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর। কমান্ডার ছিলেন ব্রিগেডিয়ার হায়াত খান। যশোর সেনানিবাস থেকে পাকিস্তানি বাহিনী ৬টি জেলা নিয়ন্ত্রণ করত।
আহমেদ সাঈদ বুলবুল, ইত্তেফাক 

COMMENTS

Mountain View
নাম

অপরাধ বার্তা অভয়নগর অর্থনীতি আন্তর্জাতিক ইতিহাস/মুক্তিযুদ্ধ ইলেক্ট্রনিক্স ইসলাম ঐতিহ্য ঐতিহ্য/সংস্কৃতি কলাম কৃষি কৃষি বার্তা কেশবপুর খেলাধুলা গ্যালারী চাকরির খবর চাকুরী চুয়াডাঙ্গা চৌগাছা জাতীয় ঝিকরগাছা ঝিনাইদহ টিপস তথ্য প্রযুক্তি দর্শনীয় স্থান নড়াইল নিবন্ধ পরিবেশ প্রকৃতি/পরিবেশ প্রতিবেদন প্রবাস প্রশাসন ফেসবুক বাঘারপাড়া বিনোদন বিশেষ খবর বেনাপোল ব্যক্তিত্ব ব্যবসা/বানিজ্য ব্রেকিং নিউজ ভর্তি পরীক্ষা ভিডিও ভ্রমন মনিরামপুর মাগুরা মুক্তিযুদ্ধ যশোর যশোর সদর রাজনীতি রান্না লাইফ স্টাইল শার্শা শিক্ষাঙ্গন সংবাদ সংস্কৃতি সম্পাদকীয় সর্বশেষ সাফল্য সারাদেশ সাহিত্য সিনেমা স্বাস্থ্য Breaking Feature Greater Jessore Tips
false
ltr
item
যশোর নিউজ ২৪: Jessore News 24:: বিজয় আমার অহংকার : যশোর
বিজয় আমার অহংকার : যশোর
http://3.bp.blogspot.com/-Bgz25FQnn9g/VH1WofImr9I/AAAAAAAAGwI/Z9xSB6hnlGg/s1600/3_47288.jpg
http://3.bp.blogspot.com/-Bgz25FQnn9g/VH1WofImr9I/AAAAAAAAGwI/Z9xSB6hnlGg/s72-c/3_47288.jpg
যশোর নিউজ ২৪: Jessore News 24:
http://www.jessorenews24.com/2014/12/blog-post_29.html
http://www.jessorenews24.com/
http://www.jessorenews24.com/
http://www.jessorenews24.com/2014/12/blog-post_29.html
true
286737489812364167
UTF-8
Not found any posts VIEW ALL Readmore Reply Cancel reply Delete By Home PAGES POSTS View All RECOMMENDED FOR YOU LABEL ARCHIVE SEARCH ALL POSTS Not found any post match with your request Back Home Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS CONTENT IS PREMIUM Please share to unlock Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy