২০ সেপ্টেম্বর, ২০১২

যশোরে মাসে তৈরি হচ্ছে ২৫০ গাড়ির বডি

বাস-ট্রাকের ইঞ্জিনটাই শুধু আসছে বাইরে থেকে। বডি তৈরি, ডেন্টিং-পেইন্টিংসহ বাকি সব কাজই হচ্ছে স্থানীয়ভাবে। আর এ কাজ করছে বিভিন্ন অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ। কেবল যশোরেই এ ধরনের ওয়ার্কশপ কারখানা আছে পাঁচ শতাধিক। যেখানে প্রতি মাসে তৈরি হচ্ছে আড়াই শয়ের মতো বিভিন্ন ধরনের গাড়ির বডি। এতে লেনদেন হচ্ছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা। তাছাড়া পুরনো বডির মেরামত তো আছেই।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যশোর সদর ও অন্য আট উপজেলায় গড়ে ওঠা পাঁচ শতাধিক অটোমোবাইল ওয়ার্কশপে কাজ করছেন বিপুল সংখ্যক শ্রমিক। হাতুড়ি-ছেনি দিয়েই তারা তৈরি করছেন বাস-ট্রাকের বডি ও কেবিন। দেখেই যে কোনো মডেলের বডিসহ অন্যান্য অংশ তৈরি করতে সক্ষম তারা। পুরনো গাড়ির চেসিসে নতুন বডিও তৈরি হচ্ছে তাদের হাত দিয়ে, ৩০-৪০ বছর পর্যন্ত যা টিকে থাকছে।
এখানে গাড়ির বডি তৈরিতে খরচও কম। এ কারণেই খুলনা, বরিশাল, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, পাবনা, রংপুর, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা, সিরাজগঞ্জসহ সারা দেশের গাড়িমালিকরা যশোর থেকেই বডি তৈরির কাজটি করিয়ে নেন।
আন্তঃজেলা বাসমালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও ঈগল পরিবহনের স্বত্বাধিকারী পবিত্র কাপুড়িয়া জানান, এখানকার মিস্ত্রিদের দিয়ে গাড়ির বডি তৈরি করলে খরচ অনেক কম পড়ে। আমরাও এখান থেকে বডি তৈরি করে থাকি। এদের কাজের মান ভালো। ঈগল পরিবহনের মতো অন্যান্য পরিবহনের মালিকরাও যশোর থেকে গাড়ির বডি তৈরি করে নিয়ে যান।
বিশেষ কোনো প্রশিক্ষণ বা তাত্ত্বিক জ্ঞান ছাড়া হাতে-কমলে শিখেই গাড়ির বডি তৈরিতে দক্ষ হয়ে উঠছেন এসব কারিগর। এমনই একজন সুলতান আহমদ। তিনি নিজেও একটি ওয়ার্কশপের মালিক। ১৫-২০ জন শ্রমিক কাজ করছেন তার অধীনে। এখানে তার মতো এমন সফল মিস্ত্রির সংখ্যা কয়েক শ। তারা প্রত্যেকেই নিজস্ব ওয়ার্কশপের মালিক।
শহরের বকচরে শাহিন অটোমোবাইল ওয়ার্কশপের স্বত্বাধিকারী শাহিন কবীর। তিনি জানান, একটি হিনো বাসের বডি ঢাকায় তৈরি করতে খরচ পড়ে প্রায় ১৩ লাখ টাকা। কিন্তু যশোরে একই গাড়ির বডি তৈরিতে খরচ হয় ৭-৮ লাখ টাকা। টাটা গাড়ির বডি তৈরিতেও অন্তত ৫ লাখ টাকা কম খরচ হয়। এ কারণেই স্থানীয় ওয়ার্কশপগুলোয় হিনো, টাটা প্রভৃতি নামি ব্র্যান্ডের গাড়ির বডি তৈরি হচ্ছে। আরএম-২, ভলভোর মতো অত্যাধুনিক বিলাসবহুল গাড়ির বডিও স্থানীয়ভাবে তৈরি করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
যশোরে মোটরগাড়ি মেরামতের কাজ শুরু হয় প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে। আশির দশকের শেষ দিকে হিনো গাড়ি আমদানি শুরু হওয়ার পর থেকে অটোমোবাইল ওয়ার্কশপগুলোর ব্যস্ততাও বেড়ে যায়। পরিসরও বাড়তে থাকে দ্রুত। শহরের বকচর থেকে মুড়লি পর্যন্ত এখন সারি সারি মোটর ওয়ার্কশপ। এর বাইরে শহরের খাজুরা বাসস্ট্যান্ড, নড়াইল রোড, কেন্দ্রীয় বাসটার্মিনালসহ বিভিন্ন উপজেলায়ও গড়ে উঠেছে অনেক ওয়ার্কশপ।
তবে কিছু সমস্যাও আছে। এর মধ্যে প্রধান সমস্যা হচ্ছে প্রয়োজনীয় অভাব। ওয়ার্কশপ মালিক-শ্রমিকদের মতে, আধুনিক মেশিনারিজ সংগ্রহ করতে প্রত্যেক ওয়ার্কশপে অন্তত ৪০ লাখ টাকা দরকার। পুঁজি সংগ্রহের জন্য ওয়ার্কশপমালিকরা বিভিন্ন ব্যাংকে ধরনা দিয়েও টাকা পাচ্ছেন না। সর্বশেষ জনতা ব্যাংক ৩০-৪০ হাজার টাকা ঋণ দিতে রাজি হয়েছে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় খুবই অপ্রতুল।
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক যশোর শাখার ব্যবস্থাপক ইউসুফ আলী এ প্রসঙ্গে বলেন, সিকিউরিটি ছাড়া কোনো ব্যাংকের পক্ষে ঋণ দেয়া সম্ভব নয়। ওয়ার্কশপমালিক তার বাসভবন বা অন্য কোনো সম্পত্তি ব্যাংকে দায়বদ্ধ রাখলে তাকে ঋণ দেয়া সম্ভব।
এ ছাড়া এসব কারখানা গড়ে উঠেছে যশোর প্রধান সড়কের ধারে আবাসিক এলাকায়। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের সমস্যায় পড়তে হয়। এ কারণে কারখানাগুলোকে এক জায়গায় আনতে ওয়ার্কশপ শিল্পপার্ক স্থাপনের দাবি জানিয়ে আসছেন কারখানামালিকরা। শিল্প পার্কের জন্য জমি দিতেও রাজি হয়েছিল বিসিক। কিন্তু এখন পর্যন্ত তা পাওয়া যায়নি।
বিসিক যশোরের এস্টেট অফিসার লুত্ফর রহমান জানান, যশোরে অটোমোবাইল ওয়ার্কশপের জন্য আলাদা বিসিক এস্টেট স্থাপনের জন্য ২০০৫ সালের ৩০ এপ্রিল শিল্প মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়।

SHARE THIS

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 coment rios: