৯ মে, ২০১২

হস্তশিল্পে ভর করে ঘুরে দাড়াচ্ছে যশোরের নারীরা



যশোরের নোঙরপুর গ্রাম বিষমুক্ত সবজি উত্পাদনের জন্য পরিচিত। এখন এটি শুধু সবজির গ্রামই নয়, নকশি কঁাথারও গ্রাম। এই গ্রামের অধিকাংশ নারী সঁুই-সুতা নিয়ে খেলা করেন। মনের ক্যানভাসে ভেসে ওঠা বিমূর্ত সব ছবিকে তারা সুঁই-সুতার ছঁোয়ায় ফুটিয়ে তোলেন নকশি কঁাথায়। শুধু নকশি কঁাথা নয়, শাড়ি, থ্রিপিস, পাঞ্জাবি, ফতুয়াসহ বিভিন্ন হস্তশিল্পসামগ্রী দৃষ্টিনন্দন হয়ে ওঠে তাদের হাতের পরশে। নান্দনিক এই হস্তশিল্পকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন নোঙরপুরসহ আশপাশ এলাকার প্রায় দুই হাজার নারী। হস্তশিল্পের মাধ্যমেই স্বাবলম্বী হয়েছেন তারা।
নোঙরপুর গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, গ্রামের নারীরা কাপড়ে সুঁই-সুতা দিয়ে নকশি কঁাথা, নকশি চাদর, হাতের কাজের শাড়ি, থ্রিপিস, পাঞ্জাবি, ফতুয়া, টুপি ও চুড়িদার তৈরি করছেন। গুনগুন করে গান গাইছেন, আর ফুটিয়ে তুলছেন নান্দনিক সব ডিজাইন। কাপড়ের ক্যানভাসে ছড়িয়ে দিচ্ছেন মনের সব রং।
এই গ্রামের হস্তশিল্পকর্মী রেহেনা খাতুন জানান, সকালে সংসারের কাজ শেষে, ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠিয়ে তিনি সেলাইয়ের কাজে হাত দেন। স্বামী মাঠ থেকে ফেরার আগে দুপুরের রান্নাসহ গৃহস্থালির কাজ করেন। বিকেলে আবার সেলাইয়ের কাজ করেন। তিনি জানান, এই কাজ করে প্রতি মাসে যা আয় করেন, তা দিয়ে তার সংসারে বেশ সচ্ছলতা এসেছে।
(হস্তশিল্পে যশোরের একজন সফল উদ্যোক্তা তনুজা রহমান। যশোর শহরের মুজিব সড়কে ‘রং হ্যান্ডিক্রাফটস’ নামে একটি প্রতিষ্ঠিত হস্তশিল্পের প্রতিষ্ঠান রয়েছে তার। যশোরের বিভিন্ন গ্রামের ২ হাজার মহিলা এবং ১০৭ জন পুরুষ হস্তশিল্পকমর্ী কাজ করেন তার অধীনে। প্রথমে ক্ষুদ্র পরিসরে শুরু করলেও চাহিদা ও প্রসারের কারণে তিনি ব্যবসার বিস্তৃতি ঘটিয়েছেন।
তনুজা রহমান মায়া বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে সামাজিক ও পারিবারিক প্রতিবন্ধকতা অনুভব করেছি। তার পরও গ্রাম বাংলার নকশাকে তুলে ধরতে চষ্টো অব্যাহত রেখেছি। তিনি আরও বলেন, একসময় প্রতিষ্ঠান বড় করতে প্রয়োজন হয় ব্যাংকঋণের। কিন্তু পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে এ ব্যাপারে এগিয়ে আসে ব্যাংক এশিয়া। তারা এসএমই নারী উদ্যোক্ত হিসেবে আমাকে ঋণ দেয়। ফলে এখন আমাকে আর অর্থ নিয়ে চিন্তা করতে হয় না)
শাহনাজ পারভীনের বাড়ি যশোর সদর উপজেলা ইছালী ইউনিয়নের কামারগন্যা গ্রামে। এ বছর তিনি উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষা দিচ্ছেন। তার এই লেখাপড়ার খরচের জন্য কারও ওপরে নির্ভর করতে হয় না। লেখাপড়া, জামাকাপড় বা হাতখরচের টাকা তিনি উপার্জন করেন সেলাই-ফঁোড়াইয়ের মাধ্যমে।
কামারগন্যা গ্রামের ক্ষুদ্রচাষি ইমান আলীর দুই ছেলেমেয়ের মধ্যে বড় শাহনাজ। শাহনাজ যখন দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়েন, তখন মা হামিদা বেগমের সহায়তায় কাপড়ে সেলাই করে ফুল তোলায় হাতেখড়ি তার। সেই শুরু। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। রুমাল, কুশন কভার, সাইডব্যাগ থেকে মোবাইল ফোনের থলে; কোথায় তোলেননি সুঁইয়ের অঁাচড়ে নকশি ফুল! এখন শাহনাজ আরও পরিপক্ব! শাড়ি, নকশি কঁাথা, বেড কভার, চাদরের ক্যানভাসে মনের মাধুরী মিশিয়ে তিনি সুঁই-সুতোয় এঁকে চলেন বাহারি সব আল্পনা ও দৃশ্য। শাহনাজ জানান, ১৫ দিন থেকে এক মাস সময়ের মধ্যে তিনি সেলাই করতে পারেন একটি শাড়ি। মায়ের সহায়তায় একই সময়ে একখানি নকশি কঁাথাও সেলাই করা যায়। এসব কাজের জন্য প্রতিটি কঁাথা থেকে দুই হাজারের মতো টাকা পাওয়া যায়। শাড়িভেদে আসে পঁাচ শ থেকে দুই হাজার। বেডশিটেও পাওয়া যায় ভালো অঙ্কের টাকা। সহায়তা পেলে ভবিষ্যতে নিজেই ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করার পরিকল্পনা আছে শাহনাজের।
শাহনাজের মা হামিদা বেগম জানান, স্বামী ইমান আলীর ক্ষেতখামার থেকে উপার্জিত টাকায় বছরের ৮ মাসও ঠিকমতো চলে না। তিনি নিজেও সেলাই করেন, সঙ্গে মেয়েও। তাদের দুজনের আয়ে সংসারের খরচ যেমন চলে, তেমনি মেয়ের লেখাপড়াও। শুধু শাহনাজরা নয়, এই গ্রামের ৫০ থেকে ৬০টি ঘরে চলছে এমন সেলাইয়ের কাজ। কামারগন্যা গ্রামে যারা সেলাইয়ের কাজ করছেন, তারা সরাসরি বিপণনের সঙ্গে জড়িত নন। তাদের কাজের ফরমায়েশ আসে শহর বা শহরতলি থেকে। ক্রেতা বা বাজারের চাহিদা অনুযায়ী হস্তশিল্প প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ডিজাইন, কাপড় আর সুতা সরবরাহ করা হয়। মাঠপর্যায়ের এসব শিল্পীই পঁেৌছে দেন সেসব পণ্য। এমন বেশ কয়েকটি হাউস রয়েছে যশোর শহরতলিতে। যাদের বলা হয়ে থাকে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা।
শহরতলি কিসমত নওয়াপাড়া এলাকায় ছোট্টপরিসরে এমন একটি প্রতিষ্ঠানের নাম তাসলিমা এন্টারপ্রাইজ। তাসলিমা বেগম যার পরিচালক। প্রায় ১২ বছর ধরে তিনি এসব হস্তশিল্পের সঙ্গে জড়িত। তিনি জানান, গ্রামের নারীদের এই হস্তশিল্পের পণ্য তারা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করে থাকেন। এ ছাড়া এই পণ্য এখন বিদেশেও যাচ্ছে। নারী উদ্যোক্তা হিসেবে সমপ্রতি শাহজালাল ব্যাংক তাকে এক লাখ টাকা ঋণ দিয়েছে। যদিও এই ঋণ তার চাহিদার তুলনায় অনেক কম।
হস্তশিল্পে যশোরের একজন সফল উদ্যোক্তা তনুজা রহমান। যশোর শহরের মুজিব সড়কে ‘রং হ্যান্ডিক্রাফটস’ নামে একটি প্রতিষ্ঠিত হস্তশিল্পের প্রতিষ্ঠান রয়েছে তার। যশোরের বিভিন্ন গ্রামের ২ হাজার মহিলা এবং ১০৭ জন পুরুষ হস্তশিল্পকমর্ী কাজ করেন তার অধীনে। প্রথমে ক্ষুদ্র পরিসরে শুরু করলেও চাহিদা ও প্রসারের কারণে তিনি ব্যবসার বিস্তৃতি ঘটিয়েছেন।
তনুজা রহমান মায়া বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে সামাজিক ও পারিবারিক প্রতিবন্ধকতা অনুভব করেছি। তার পরও গ্রাম বাংলার নকশাকে তুলে ধরতে চষ্টো অব্যাহত রেখেছি। তিনি আরও বলেন, একসময় প্রতিষ্ঠান বড় করতে প্রয়োজন হয় ব্যাংকঋণের। কিন্তু পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে এ ব্যাপারে এগিয়ে আসে ব্যাংক এশিয়া। তারা এসএমই নারী উদ্যোক্ত হিসেবে আমাকে ঋণ দেয়। ফলে এখন আমাকে আর অর্থ নিয়ে চিন্তা করতে হয় না।
নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ প্রদান প্রসঙ্গে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক যশোর শাখার ব্যবস্থাপক ও ভাইস প্রেসিডেন্ট সাঈদুর রহমান জানান, গত বছরের ২৯ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান ১০ নারী ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার মাঝে ঋণ দিয়ে আমাদের এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। ৫০ হাজার থেকে শুরু করে এক লাখ টাকা দেওয়া হয় ঋণ হিসেবে।
এই খাতে ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বর্তমানে ৮০ জন। তিনি উলে্লখ করেন, উদ্যোক্তারা যদি সফলতার সঙ্গে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন, তবে ঋণের অঙ্ক আরও বাড়ানোর ইচ্ছা প্রতিষ্ঠানের আছে।



SHARE THIS

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 coment rios: